আর্মেনিয়ায় বিনিয়োগে রেসিডেন্সি ও নাগরিকত্বের পূর্ণাঙ্গ সুযোগ!

লাখ লাখ টাকার বাড়তি খরচ এবং আইইএলটিএস (IELTS)-এর জটিলতা ছাড়াই পুরো পরিবার নিয়ে ইউরোপের দোরগোড়ায় স্থায়ীভাবে থাকার এক অভিনব সুযোগ তৈরি হয়েছে আর্মেনিয়ায়। মাত্র দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকার প্রাথমিক খরচে ব্যবসা শুরু করে কিংবা ৮ থেকে ১২ লাখ টাকার সম্ভাব্য বিনিয়োগে সরাসরি ৫ বছরের পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি (PR) এবং মাত্র ৩ বছরে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন তানজিল আহমেদ জনি।

কেন আর্মেনিয়া বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের জন্য আদর্শ?

পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত আর্মেনিয়া একটি সুন্দর, শান্ত ও ঐতিহাসিক দেশ। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাজ্যের কোটি কোটি টাকার খরচ এবং জটিল পয়েন্ট সিস্টেমের বিপরীতে আর্মেনিয়া বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত সহজ ও সাশ্রয়ী একটি বিকল্প:

পয়েন্ট ও IELTS মুক্ত সহজ নিয়ম: এখানে কোনো আইইএলটিএস (IELTS) পরীক্ষা, জব অফার বা বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্সের বাধ্যবাধকতা নেই।

স্বল্প খরচে সেটেলমেন্ট: মাত্র ১.৫ থেকে ২.৫ লাখ টাকার মধ্যে প্রথম ধাপে ভ্রমণ ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব।

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও পরিবার সুবিধা: মূল আবেদনকারীর সাথে স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মা একসঙ্গে রেসিডেন্সি পান। বাংলাদেশি পাসপোর্ট বহাল রেখে দ্বৈত নাগরিকত্ব নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নিরাপদ ও সুবান্ধব পরিবেশ: দেশে অপরাধের হার অত্যন্ত কম, এবং মুসলিমদের জন্য হালাল খাবার ও মসজিদের সুবিধা রয়েছে।

প্রথমবার প্রবেশ ও ভিসা পাওয়ার উপায়

বাংলাদেশে আর্মেনিয়ার কোনো নিজস্ব দূতাবাস না থাকায় ভারতের নতুন দিল্লিতে অবস্থিত এম্বাসির মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করতে হয়। বাংলাদেশে প্রবেশের প্রধান দুটি পথ হলো:

এজেন্সির মাধ্যমে: এটা সহজ পথ। এতে নির্ভরযোগ্য এজেন্সির মাধ্যমে আর্মেনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত ইনভিটেশন লেটার সংগ্রহ করে ভিসার আবেদন করা যায়। এতে ঢাকার ঠিকানাতেই পাসপোর্ট ডেলিভারি পাওয়া যায়। ভিসা ফি প্রায় ১০,০০০–১১,২০০ টাকা এবং সার্ভিস ফি সহ মোট খরচ ২৫,০০০ টাকার মতো পড়ে; সময় লাগে ১৫–২০ কার্যদিবস। এছাড়াও প্রয়োজন পড়ে ৬ মাসের মেয়াদসহ পাসপোর্ট, ২-৪ কপি ছবি, ৪-৫ লাখ টাকার ব্যাংক স্টেটমেন্ট, হোটেল বুকিং ও ভিসা আবেদন ফর্ম।

নিজের উদ্যোগে: আর্মেনিয়ার কোনো হোটেল বা ট্যুর অপারেটর থেকে অফিশিয়াল ইনভিটেশন লেটার নিয়ে সরাসরি দিল্লির আর্মেনিয়ান এম্বাসিতে জমা দেওয়া যায়। অথবা দুবাই গিয়ে এক সপ্তাহের ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে সেখানকার আর্মেনিয়ান এম্বাসি থেকেও ভিসা সংগ্রহ করা সম্ভব।

ফ্লাইট রুট: ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে ইয়ারেভান, দোহা হয়ে কাতার এয়ারওয়েজ, অথবা ইস্তাম্বুল হয়ে টার্কিশ এয়ারলাইন্সে ভ্রমণ করা যায়। আসা-যাওয়ার এয়ার টিকিট খরচ সাধারণত ৫০,০০০ থেকে ৯০,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।

ব্যবসায়ের মাধ্যমে সাময়িক রেসিডেন্সি (TR) ও কিছু বিজনেস আইডিয়া

আর্মেনিয়ায় ১ বছরের টেম্পোরারি রেসিডেন্সি (TR) পেতে হলে একটি নিবন্ধিত ব্যবসা থাকতে হয় এবং নিয়মিত ট্যাক্স প্রদান করতে হয়:

জনপ্রিয় বিজনেস মডেলগুলো:

অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং: আইটি প্রফেশনাল বা গ্রাফিক ডিজাইনাররা আর্মেনিয়ায় কোম্পানি খুলে Fiverr/Upwork অ্যাকাউন্টের পেমেন্ট আর্মেনিয়ার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করতে পারেন।

ইউটিউব ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন: সোশ্যাল মিডিয়া বা ইউটিউব অ্যাডসেন্সের আয় কোম্পানি অ্যাকাউন্টে এনে ০-৫% ট্যাক্স দিয়ে বৈধ ব্যবসা দেখানো যায়।

ই-কমার্স ও ড্রপশিপিং: চীন বা বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য এনে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে অনলাইন শপের মাধ্যমে বিক্রি করা যায়।

কনসাল্টিং সার্ভিস: অ্যাকাউন্টিং, আইটি বা মার্কেটিং কনসালটেন্সি ফার্ম গঠন।

ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট: বাংলাদেশ থেকে চা, মসলা, তৈরি পোশাক বা চামড়াজাত পণ্য আর্মেনিয়া ও রাশিয়ায় রপ্তানি।

রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ: রাজধানী ইয়ারেভানে ২০–৬০ লাখ টাকায় ১ থেকে ৩ রুমের ফ্ল্যাট কিনে প্রতি মাসে ৩০,০০০–৮০,০০০ টাকা ভাড়া পাওয়া সম্ভব, যা আয়ের উৎস হিসেবে দেখানো যায়।

ছোট রেস্টুরেন্ট বা ফুড ক্যাফে: ডাইনিং বা ডেলিভারি ভিত্তিক হালাল/বাঙালি খাবারের ব্যবসা।

আবেদন ও কার্ড প্রদান: স্থানীয় আইনজীবীর মাধ্যমে (ফি ৫০০–১০০০ ইউরো) কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করে মাইগ্রেশন পোর্টালে (migration.gov.am) আবেদন করতে হয়। সরকারি ফি প্রায় ১৮,০০০ টাকা এবং কার্ড পেতে ১৫–৩০ দিন সময় লাগে।

পরিবার যুক্তকরণ: স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানদের ‘ফ্যামিলি রিইউনিফিকেশন’ প্রক্রিয়ায় মাথাপিছু ১৮,০০০ টাকা সরকারি ফি দিয়ে ১ বছরের টিআর কার্ড দেওয়া হয়।

২০২৬ সালের ‘ইনভেস্টর ফার্স্ট-ট্র্যাক পিআর (PR)’ সংশোধনী

২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি ঘোষিত ইমিগ্রেশন আইন সংস্কারের আওতায় ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে সরাসরি ৫ বছরের ইনভেস্টর পিআর (PR) প্রোগ্রাম চালু হতে যাচ্ছে:

সুবিধা: কোনো মিনিমাম স্টে বা প্রতি মাসে আর্মেনিয়ায় থাকার বাধ্যবাধকতা নেই; সরাসরি ৫ বছরের জন্য পিআর কার্ড পাওয়া যাবে।

বিনিয়োগের খাতসমূহ:

স্থানীয় ব্যবসা চালু বা ক্যাপিটাল ইনজেকশন।

ইয়ারেভানে রিয়েল এস্টেট (ফ্ল্যাট/জমি) ক্রয়।

সরকারি বন্ড বা সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ।

আইটি, কৃষি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ইনোভেশন প্রকল্প।

আর্থিক পরিমাণ (ইনভেস্টমেন্ট থ্রেশহোল্ড): অফিশিয়ালি এখনো সুনির্দিষ্ট অঙ্ক ঘোষণা না হলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী এর পরিমাণ আনুমানিক ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা হতে পারে।

বিশেষ সময়সীমা: ১ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ডিজিটাল সিস্টেমে কম খরচে আবেদন করা যাবে, কারণ ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে সরকারি ফি বৃদ্ধি পাবে। নির্দিষ্ট কোটাভিত্তিক আবেদন গ্রহণ করা হবে।

৩ বছরে পাসপোর্ট ও ভবিষ্যতের ইউরোপিয়ান সম্ভাবনা

আর্মেনিয়ায় রেসিডেন্সি বা পিআর বজায় রেখে মাত্র ৩ বছর পর সরাসরি নাগরিকত্ব ও পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা যায়।

সিটিজেনশিপ পরীক্ষা: কোনো জটিল ভাইভা নেই; কেবল আর্মেনিয়ান ভাষার ওপর ৩৩টি এমসিকিউ (MCQ) এবং সংবিধান সম্পর্কিত ৩৩টি এমসিকিউ পরীক্ষায় পাস করতে হয়। ১৮ বছরের কম বয়সীদের এই পরীক্ষা দিতে হয় না। পাসপোর্ট আবেদন ফি প্রায় ১৭০ ডলার।

পাসপোর্টের ক্ষমতা:

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬৪-৬৯টি দেশে ভিসা-ফ্রি বা অন-অ্যারাইভাল ভ্রমণের সুবিধা।

ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন (EAEU): রাশিয়া, কাজাখস্তান, বেলারুশ ও কিরগিজস্তানে কোনো অতিরিক্ত ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই সরাসরি কাজ ও বসবাসের অধিকার।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (EU) ও শেনজেন সম্ভাবনা: ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ইইউ কমিশনের সাথে ভিসা লিবারলাইজেশন আলোচনা শুরু হয়েছে এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে আর্মেনিয়াকে ৭৪ পয়েন্টের অ্যাকশন প্ল্যান দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের মার্চে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট আর্মেনিয়াকে ইইউ সদস্যপদ দেওয়ার প্রস্তাব পাশ করায় আগামী ২-৫ বছরের মধ্যে এই পাসপোর্ট দিয়ে পুরো ইউরোপে (শেনজেন এলাকা) ভিসা-মুক্ত চলাচলের দারুণ সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

যা অবশ্যই মনে রাখতে হবে:

এনএসএস (NSS) ব্যাকগ্রাউন্ড চেক: শুধু কাগজে-কলমে ভুয়া কোম্পানি খুললে ন্যাশনাল সিকিউরিটি সার্ভিস তদন্ত করে রেসিডেন্সি বাতিল করে দিতে পারে; ব্যবসা প্রকৃত হতে হবে।

মিলিটারি সার্ভিস নিয়ম: নির্দিষ্ট বয়সের পুরুষদের নাগরিকত্ব গ্রহণের পর সামরিক সেবা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে, যা আগেই জেনে নেওয়া ভালো।

ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আবহাওয়া: আজারবাইজানের সাথে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং শীতকালে প্রচণ্ড ঠান্ডা আবহাওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন।

তানজিল আহমেদ জনি/ প্রবাস/ ৩ এপ্রিল ২০২৬

You may also like...