কম খরচে সরকারিভাবে ব্রুনেই কাজের ভিসা!
বিদেশে গিয়ে ভালো উপার্জনের স্বপ্ন দেখছেন, কিন্তু দালালের ভয় ও মোটা অঙ্কের খরচের চিন্তায় পিছিয়ে যাচ্ছেন? দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ট্যাক্স-মুক্ত শান্ত দেশ ব্রুনেইতে এখন সরকারি সংস্থা বোয়েসেল (BOESL)-এর মাধ্যমে মাত্র ৪৪,৮৫০ থেকে ৫৬,৩৫০ টাকায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে! শূন্য আয়কর, ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত গড় বেতন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন তানজিল আহমেদ জনি।
ব্রুনেই চাকরির বাজার ও অর্থনৈতিক চিত্র
বাংলাদেশীদের জন্য ব্রুনেই কোনো নতুন গন্তব্য নয়। ১৯৯২ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ৭৭,৯৫৮ জন বাংলাদেশী ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে সফলভাবে ব্রুনেইতে গিয়েছেন।
ব্রুনেই কাজের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণসমূহ:
জিরো ইনকাম ট্যাক্স: ব্রুনেইতে কোনো ব্যক্তিগত আয়কর বা ভ্যাট (VAT) নেই, ফলে আপনার অর্জিত কষ্টের টাকা পুরোপুরি আপনার পকেটেই থাকে।
আকর্ষণীয় বেতন: ব্রুনেইতে কাজের গড় বেতন প্রায় ২,৫০০ ব্রুনিয়ান ডলার, যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
কম প্রতিযোগিতা: কোভিড-পরবর্তী সময়ে কর্মী নেওয়ার হার সাময়িক কমে যাওয়ায় বর্তমানে আবেদনকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেশ কম।
পেশাভিত্তিক সম্ভাব্য বেতনের তালিকা
ব্রুনেইতে বিভিন্ন দক্ষ ও অদক্ষ খাতে ভালো বেতনে কাজের সুযোগ রয়েছে:
ওয়েল্ডার বা পাইপ ফিটার: ১,০৮,০০০ টাকা থেকে ২,২৫,০০০ টাকা।
নির্মাণ শ্রমিক: ৭২,০০০ টাকা থেকে ১,৩৫,০০০ টাকা।
কেয়ারগিভার: ৭২,০০০ টাকা থেকে ১,৩৫,০০০ টাকা।
রেস্টুরেন্ট কর্মী: ৬৩,০০০ টাকা থেকে ১,০৮,০০০ টাকা।
সরকারিভাবে আবেদনের ধাপ ও ভিসা প্রক্রিয়া
ব্রুনেইতে বিদেশী কর্মীদের মূল ওয়ার্ক পারমিট হলো LPA ভিসা (Lesen Pekerja Asing), যার মেয়াদ ২ বছর এবং এটি নবায়নযোগ্য। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সরকারি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল (BOESL)-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
আবেদনের ৪টি সহজ ধাপ:
- অনলাইন রেজিস্ট্রেশন: বোয়েসেলের অফিশিয়াল পোর্টাল (brms.gov.bd)-এ মাত্র ১০০ টাকা ফি দিয়ে প্রথমে নিবন্ধন করতে হবে।
- খাত নির্বাচন: আপনার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ক্যাটাগরি (নির্মাণ, রেস্টুরেন্ট, নার্সিং, কেয়ারগিভিং ইত্যাদি) নির্বাচন করুন।
- মেডিকেল ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স: প্রাথমিক বাছাইয়ে নির্বাচিত হলে মেডিকেল পরীক্ষা এবং পুলিশ ক্লিয়ারেন্স জমা দিতে হবে।
- ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু: নিয়োগকর্তা LPA গ্রহণের পর কাগজপত্র জমা দিলে প্রায় ২ সপ্তাহের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়।
সরকারি খরচ বনাম বেসরকারি দালালের ফাঁদ
| খাতের বিবরণ | জিটুজি (G2G) সরকারি খরচ | প্রাইভেট এজেন্সির খরচ/ঝুঁকি |
| দক্ষ কর্মী (Skilled) | ৫৬,৩৫০ টাকা | ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত। |
| অদক্ষ কর্মী (Unskilled) | ৪৪,৮৫০ টাকা | চরম প্রতারণা ও অর্থ হারানোর ঝুঁকি। |
বিমান টিকিট ও ফ্লাইট রুট
ঢাকা থেকে ব্রুনেই সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই, তাই কানেক্টিং ফ্লাইটে যেতে হয়।
প্রধান ৩টি রুট: কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) হয়ে (৭-৮ ঘণ্টা), সিঙ্গাপুর হয়ে (১০ ঘণ্টা), অথবা ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) হয়ে।
টিকিট খরচ: একমুখী (One-way) টিকিটের গড় মূল্য প্রায় ৩০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৩,০০০ টাকা। রিটার্ন টিকিট ৫৭,০০০ থেকে ১,০৬,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
সাশ্রয়ী টিপস: কম দামে টিকিট পেতে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ভ্রমণের অন্তত ২ মাস আগে বুকিং করা ভালো।
স্থানীয় জীবনযাত্রা, পিআর (PR) ও নাগরিকত্বের নিয়ম
নিরাপত্তা ও সংস্কৃতি: ব্রুনেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম নিরাপদ ও কম অপরাধপ্রবণ মুসলিম প্রধান দেশ। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০% বিদেশী নাগরিক।
স্থায়ী বাসস্থান (PR): ব্রুনেইয়ের নাগরিককে বিয়ে করলে বা সেখানে সন্তান জন্ম নিলে ১০ বছর এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে অন্তত ১৫ বছর বৈধভাবে থাকলে পিআর-এর আবেদন করা যায়।
গ্রীন আইসি (Green IC): ব্রুনেই পৌঁছানোর ৩ মাসের মধ্যে ২০৪ ব্রুনিয়ান ডলার ফি দিয়ে গ্রীন আইডেন্টিটি কার্ড নিতে হয়, অন্যথায় জরিমানা হতে পারে।
নাগরিত্বের বাস্তবতা: ২৫ বছরের মধ্যে কমপক্ষে ২০ বছর ব্রুনেইতে থাকতে হয়। ব্রুনেই দ্বৈত নাগরিকত্ব সমর্থন করে না, তাই নাগরিকত্ব নিতে হলে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ছাড়তে হবে।
সতর্কতা
আবেদনের উপযুক্ত সময়: প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে আবেদন করা উত্তম, কারণ এই সময়ে নিয়োগকর্তারা বেশি কর্মী নেন। রমজান মাসে প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়।
স্বাস্থ্য বীমা: বিদেশে যাওয়ার আগে অন্তত ১ লক্ষ ব্রুনিয়ান ডলার (প্রায় ৭৪,০০০ টাকা) কভারেজের স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
জরুরি তহবিল: চাকরি হারানোর ঝুঁকি এড়াতে সর্বদা অন্তত ৩ মাসের চলার মতো জরুরি অর্থ সঞ্চয় রাখুন।
আইন কানুন: ব্রুনেইতে কঠোর শরিয়াহ আইন প্রযোজ্য। অমুসলিমদের জন্যও মদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং সুলতান সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করা গুরুতর অপরাধ।
তানজিল আহমেদ জনি/ প্রবাস/ ২০ ডিসেম্বর ২০২৫
