ট্যুরিস্ট ভিসায় পেরুতে সেটেল হওয়ার সহজ উপায়!
আইএলটিএস (IELTS) নেই? বড় ব্যাংক ব্যালেন্স কিংবা চাকরির অফার লেটার ছাড়াও কি উন্নত দেশে সেটেল হওয়া সম্ভব? মাত্র ২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় ট্যুরিস্ট ভিসায় পেরু গিয়ে কীভাবে বৈধভাবে ওয়ার্ক পারমিট, পিআর এবং বিশ্বমানের শক্তিশালী পাসপোর্ট অর্জন করবেন—তার নিখুঁত ও বাস্তবিক গাইডলাইন নিয়ে লিখেছেন তানজিল আহমেদ জনি।
কানাডা, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে ইমিগ্রেশনের নিয়ম দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। আইএলটিএস-এর উচ্চ স্কোর, বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্স এবং চড়া ভিসা ফি-এর কারণে মধ্যবিত্তের স্বপ্নের পথ থমকে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ আমেরিকার উদীয়মান দেশ পেরু হয়ে উঠছে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। পেরুতে সেটেল হওয়ার জন্য কোনো আইএলটিএস বা ডিগ্রি বাধ্যতামূলক নয়, আর কোনো বড় ব্যাংক ব্যালেন্সের চাপও নেই। এমনকি বাংলাদেশি পাসপোর্টে ট্যুরিস্ট ভিসায় প্রবেশ করে সেখান থেকেই সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় ওয়ার্ক পারমিট ও নাগরিকত্ব অর্জন করা সম্ভব।
কেন পেরু মধ্যবিত্তদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ?
পেরু কেবল ইনকা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ বা আমাজনের জঙ্গল দিয়ে ঘেরা দেশ নয়; এটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আধুনিক জীবনযাত্রার এক চমৎকার মেলবন্ধন। মধ্যবিত্তের জন্য পেরুকে আদর্শ মনে করার প্রধান কারণগুলো হলো:
আইএলটিএস (IELTS) ও ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা নেই: এন্ট্রি লেভেলের কাজের জন্য কোনো শিক্ষাগত ডিগ্রি বা ইংরেজি ভাষার আইএলটিএস স্কোর লাগে না।
বড় ব্যাংক ব্যালেন্সের প্রয়োজন নেই: প্রথাগত উন্নত দেশের মতো লাখ লাখ টাকার ব্যাংক স্থিতি দেখাতে হয় না।
১০০% নিজস্ব মালিকানায় ব্যবসা: বিদেশী হিসেবে শতভাগ নিজস্ব মালিকানায় কোম্পানি খোলা যায়।
অনলাইন ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা: পেরুর সরকারি ইমিগ্রেশন দপ্তর (Migraciones) পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পাদনের সুযোগ দেয়।
দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবিধা: বাংলাদেশ সরকার পেরুসহ দক্ষিণ আমেরিকার ১২টি দেশের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন করেছে; ফলে পেরুর পাসপোর্ট পেলেও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ছাড়তে হয় না।
ধাপ ১: ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
বাংলাদেশে পেরুর কোনো দূতাবাস নেই। তাই বাংলাদেশীদের নিকটস্থ ভারতের নয়া দিল্লির পেরু এম্বাসিতে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আবেদন জমা দিতে হবে। মিডিল ইস্টে বসবাসকারীদের ক্ষেত্রে আবুধাবি বা দুবাইয়ের পেরু কনস্যুলেট থেকে আবেদনের সুযোগ রয়েছে।
আবেদনের সময়সূচী: নয়া দিল্লি এম্বাসিতে সোমবার থেকে শুক্রবার, সকাল ১০:০০ টা থেকে দুপুর ১২:০০ টার মধ্যে নথিপত্র জমা দিতে হয়।
প্রয়োজনীয় নথিপত্র:
১. পাসপোর্ট: ন্যূনতম ৬ মাস মেয়াদী মূল পাসপোর্ট।
২. ডিজিসি (DGC) ফর্ম: ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করা ২ কপি ফর্ম (টাইপ করে বা হাতে ব্লক লেটারে পূরণকৃত)।
৩. ছবি: ৩ কপি রঙিন ছবি।
৪. কাভার লেটার: আবেদনের কারণ, অবস্থান ও সময়সূচী উল্লেখ করে নিজের স্বাক্ষরিত চিঠি। ৫. রাউন্ড-ট্রিফ টিকিট রিজার্ভেশন: যেকোনো ট্রাভেল এজেন্সি থেকে রিটার্ন টিকিট বুকিং কনফার্মেশন কপি।
৬. হোটেল বুকিং: ন্যূনতম ১ সপ্তাহের হোটেল বুকিং (যেমন Agoda বা Booking.com থেকে)। ৭. ব্যাংক স্টেটমেন্ট: গত ৩ মাসের সচল ব্যাংক স্টেটমেন্ট। অফিশিয়ালি নির্দিষ্ট অংক বলা না থাকলেও ন্যূনতম ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং নিয়মিত লেনদেনের প্রমাণ থাকা আবশ্যক।
৮. পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট: সকল আবেদনকারীর (বিশেষ করে নারী আবেদনকারীদের) জন্য বাধ্যতামূলক।
৯. ট্যাক্স ও আয়ের নথি: বিগত ১ বছরের ট্যাক্স রিটার্ন স্লিপ, চাকরিজীবীদের জন্য ৬ মাসের পে-স্লিপ অথবা ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসার কাগজপত্র।
ফি ও প্রসেসিং সময়:
ভিসা ফি: ৩,০০০ ইন্ডিয়ান রুপি (প্রায় ৪,৪০০ বাংলাদেশী টাকা)।
প্রসেসিং সময়: ১৫ থেকে ২০ কর্মদিবস (সর্বোচ্চ ১ মাস)।
মেয়াদ: ভিসা ইস্যুর ৬ মাসের মধ্যে পেরুতে প্রবেশ করতে হয় এবং ট্যুরিস্ট ভিসায় সর্বোচ্চ ১৮৩ দিন অবস্থান করা যায়।
ধাপ ২: ট্রানজিট ভিসা ছাড়া সবচেয়ে নিরাপদ বিমান রুট
বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ইউরোপের ট্রানজিট ভিসা পাওয়া কঠিন, তাই ইউরোপ এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। ট্রানজিট ভিসা ছাড়া পেরুর রাজধানী লিমাতে পৌঁছানোর সেরা ও পরীক্ষিত রুটটি হলো:
ঢাকা ➔ দোহা (কাতার) ➔ সাও পাওলো (ব্রাজিল) ➔ লিমা (পেরু)
এয়ারলাইন্স ও টিকেট বুকিং (PNR নিয়ম): ঢাকা থেকে দোহা এবং দোহা থেকে সাও পাওলোর জন্য ‘কাতার এয়ারওয়েজ’ এবং সাও পাওলো থেকে লিমার জন্য ‘লাতাম এয়ারলাইন্স’ (LATAM Airlines) ব্যবহার করতে হবে। কাতার এয়ারওয়েজ ও লাতামের মধ্যে কোট-শেয়ার (Codeshare) চুক্তি থাকায় একটিমাত্র PNR নম্বরে টিকেট ইস্যু করতে হবে।
- সুবিধা: একই PNR-এ টিকেট কাটলে ব্রাজিলের সাও পাওলো বিমানবন্দরে এয়ারসাইড ট্রানজিটে কোনো ব্রাজিলিয়ান ট্রানজিট ভিসা লাগে না এবং লাগেজ সরাসরি লিমায় পৌঁছে যায়।
- বিমান ভাড়া: একমুখী টিকিটের খরচ প্রায় ৯৬,০০০ টাকা এবং রাউন্ড-ট্রিফ টিকিটের ক্ষেত্রে ১.৫ থেকে ১.৮ লাখ টাকা হতে পারে।
ধাপ ৩: ট্যুরিস্ট ভিসা থেকে পিআর পাওয়ার ২টি আইনি পথ
পেরুতে পৌঁছানোর পর ট্যুরিস্ট ভিসায় থাকা অবস্থায় বৈধ উপায়ে সেটেল হওয়ার ২টি স্বীকৃত পথ রয়েছে:
পথ ১: চাকরি ও ওয়ার্ক পারমিট
আপনি যদি চাকরি করে সেটেল হতে চান, তবে লিমার বড় বড় বিপিও (BPO), কল সেন্টার বা কাস্টমার সার্ভিস সেক্টরে চেষ্টা করতে পারেন। ভালো ইংরেজি জানা থাকলে এসব প্রতিষ্ঠানে সহজেই চাকরি পাওয়া সম্ভব।
চাকরির সুযোগ ও প্রতিষ্ঠান: টেলিপারফরম্যান্স, আতেন্তো এবং কোনেকটা-র মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিয়মিত বিদেশী কর্মী নিয়োগ দেয়। ইংরেজিতে দক্ষ হলে শুরুতেই মাসিক বেতন হতে পারে প্রায় ৭৩,০০০ টাকা।
ওয়ার্ক পারমিটের নিয়ম:
১. কর্মসংস্থান চুক্তিটি অবশ্যই ন্যূনতম ১২ মাসের হতে হবে।
২. শ্রম মন্ত্রণালয় (MTPE) থেকে ৫-৭ কর্মদিবসের মধ্যে চুক্তি অনুমোদন করাতে হয়।
৩. এরপর মাইগ্রাসিওনস-এর ওয়েবসাইট (Cambio de Calidad Migratoria)-এ আবেদন করতে হবে।
৪. সরকারি ফি ১৬১ পেরুভিয়ান সোল (Pagalo.pe বা Banco de la Nación-এ জমা দিতে হয়)।
৫. অনুমোদন শেষে বৈধ রেসিডেন্স কার্ড বা ‘কার্নে দে এক্সত্রানহেরিয়া’ (Carné de Extranjería) প্রদান করা হয়।
পথ ২: নিজের কোম্পানি ও সেলফ-স্পন্সরশিপ
চাকরি না পেলে বা নিজে ব্যবসা করতে চাইলে শতভাগ আইনিভাবে নিজের কোম্পানি খুলে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে ওয়ার্ক পারমিট নেওয়া যায়।
কোম্পানি গঠন (S.A.C.): পেরুতে S.A.C. (Sociedad Anónima Cerrada) কাঠামোতে কোম্পানি খুলতে হয়। সুনার্প (SUNARP)-এ নাম রিজার্ভেশন ও নোটারি নিবন্ধনে খরচ হয় ১,০০০ থেকে ১,৬০০ ইউএস ডলার (প্রায় ১.২ থেকে ১.৮ লাখ টাকা)। কোম্পানিতে কমপক্ষে ২ জন শেয়ারহোল্ডার থাকতে হয়।
বিশেষ অনুমতি ও চুক্তি: চুক্তিতে সই করার আগে মাইগ্রাসিওনস থেকে Permiso para Firmar Contratos অনুমতি নিতে হয়। একজন আইনজীবীর মাধ্যমে নিজেকে জেনারেল ম্যানেজার করে চুক্তি তৈরি করে শ্রম মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশনে জমা দিতে হয়।
বেতন ও ট্যাক্স: জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে বছরে ন্যূনতম ১২,০০০ ইউএস ডলার (মাসে ১,০০০ ডলার বা প্রায় ১,১০,০০০ টাকা) নিজেকে বেতন দিতে হবে এবং সুনাত (SUNAT)-এ ট্যাক্স রেকর্ড রাখতে হবে।
৮০/২০ নিয়মে ছাড়: পেরুর সাধারণ প্রতিষ্ঠানে ৮০% পেরুভিয়ান কর্মী রাখার নিয়ম থাকলেও বিদেশী বিনিয়োগকারী ও জেনারেল ম্যানেজার পদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
মোট খরচ: প্রথম বছরে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন, আইনি ফি, ওয়ার্ক পারমিট ও অ্যাকাউন্টস ট্যাক্স মিলে মোট খরচ হতে পারে ২,৭০০ থেকে ৫,০০০ ইউএস ডলার (প্রায় ৩ থেকে ৬ লাখ টাকা)।
ধাপ ৪: ৩ বছর পর স্থায়ী বসবাস বা পিআর (PR)
টানা ৩ বছর বৈধ ওয়ার্ক ভিসায় পেরুতে অবস্থান করার পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করা যায়।
পিআর পাওয়ার শর্তাবলী: ৩ বছরের বৈধ বসবাস, ১০টি ট্যাক্স ইউনিটের (UIT) সমপরিমাণ ট্যাক্স প্রদান, বার্ষিক আয়ের প্রমাণ, ক্লিয়ার পুলিশ রেকর্ড ও নিয়মিত পে-স্লিপ বা ট্যাক্স ডিক্লেয়ারেশন জমা দিতে হয়।
সুবিধা: পিআর পেলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বসবাস ও কাজ করার অধিকারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, পেইড লিভ ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো পেরুভিয়ান নাগরিকদের সমান সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়।
ধাপ ৫: ৫ বছর পর শক্তিশালী পাসপোর্ট ও দ্বৈত নাগরিকত্ব
পেরুতে ৫ বছর বৈধভাবে বসবাস করার পর নাগরিকত্বের আবেদন করা যায়।
আবেদন ফি: সরকারি ফি মাত্র ১২,৮০০ টাকা সমপরিমাণ।
পরীক্ষা: স্প্যানিশ ভাষার এ২ (A2) লেভেলের একটি সহজ পরীক্ষা এবং পেরুর ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা দিতে হয়।
পেরুর পাসপোর্টের ক্ষমতা: পেরুর পাসপোর্ট দিয়ে ইউরোপের সম্পূর্ণ সেঞ্জেনভুক্ত দেশসমূহ, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশসহ বিশ্বজুড়ে ১৪৯টিরও বেশি দেশে ভিসা ছাড়া বা অন-অ্যারাইভাল ভিসায় ভ্রমণ করা যায়।
দ্বৈত নাগরিকত্ব: বাংলাদেশ ও পেরু উভয় দেশই দ্বৈত নাগরিকত্ব মেনে নেয়, ফলে দুটি দেশের পাসপোর্টই একসাথে রাখা সম্ভব।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
১. একই PNR টিকেট বাধ্যতামূলক: ব্রাজিল হয়ে যাওয়ার সময় ঝামেলা এড়াতে অবশ্যই কাতার এয়ারওয়েজ ও লাতাম এয়ারলাইন্সের টিকিট একই PNR-এ বুক করবেন।
২. ওভারস্টে এড়িয়ে চলুন: ট্যুরিস্ট ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ওয়ার্ক ভিসার আবেদন করতে হবে। ওভারস্টে করলে প্রতিদিন ১.২০ ডলার (প্রায় ১৫০ টাকা) জরিমানা হবে এবং বারবার করলে দেশে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
৩. স্প্যানিশ ভাষা শিখুন: পেরুতে দৈনন্দিন জীবন ও কাজের প্রধান ভাষা স্প্যানিশ। Duolingo অ্যাপ বা ইউটিউব থেকে আগে থেকেই স্প্যানিশ শেখা শুরু করা উচিত।
৪. আইনজীবী নিয়োগ করুন: সেলফ-স্পন্সরশিপ বা কোম্পানি নিবন্ধনের কাজগুলো কোনো অভিজ্ঞ পেরুভিয়ান লয়ারের মাধ্যমে করানোই সবচেয়ে নিরাপদ।
৫. নতুন নাগরিকত্ব আইন (আইন নং ৩১২ ৪৮): সম্প্রতি ২০২৫ সালের আগস্টে পাস হওয়া নতুন আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব আবেদনের জন্য বছরে ১৫,০০০ ডলার আয়ের প্রমাণ লাগতে পারে, তাই আবেদনের আগে ইমিগ্রেশনের সর্বশেষ অফিশিয়াল আপডেট দেখে নেওয়া উচিত।
মাত্র ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার প্রাথমিক বাজেট ও একটি ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা মেনে চললে ৫ বছরের মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার সুন্দর এই দেশটির নাগরিক হওয়া সম্ভব।
তানজিল আহমেদ জনি/ প্রবাস/ ৮ ডিসেম্বর ২০২৫
