আইইএলটিএস ছাড়াই লুক্সেমবার্গে মাসে ১.৫ লাখ টাকার পেইড ট্রেইনিশিপ!
স্বপ্নের মতো মনে হলেও সত্যি! কোনো আইইএলটিএস (IELTS)-এর বাধ্যবাধকতা ছাড়াই ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ লুক্সেমবার্গে মাসে ১.৫ লক্ষাধিক টাকা বেতনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পেইড ট্রেইনিশিপ অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে।
ইউরোপিয়ান কমিশন, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের এই ৩টি ফ্ল্যাগশিপ ট্রেইনিশিপ প্রোগ্রাম, আবেদন প্রক্রিয়া, খরচের হিসাব, ভিসা গাইডলাইন এবং স্থায়ী বসবাসের পথ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন তানজিল আহমেদ জনি।
মূল ৩টি পেইড ট্রেইনিশিপ প্রোগ্রাম:
প্রধানত ৩টি শীর্ষস্থানীয় ইউরোপীয় ইনস্টিটিউটের পেইড ট্রেইনিশিপের কথা নিচে উল্লেখ করা হলো:
ব্লুবুক ট্রেনিংশিপ (Blue Book Traineeship):
প্রতিষ্ঠান: ইউরোপীয় কমিশন।
কর্মস্থল: বেলজিয়ামের ব্রাসেলস অথবা লুক্সেমবার্গ।
মেয়াদ ও ভাতা: ৫ মাস মেয়াদী এই প্রোগ্রামে প্রতি মাসে ১,৪৯৩ ইউরো (প্রায় ১.৭০-১.৮০ লাখ টাকা) স্টাইপেন্ড দেওয়া হয়।
আবেদনের সময়সূচী: বছরে দুইবার (মার্চ ও অক্টোবর) আবেদন গ্রহণ করা হয়।
যোগ্যতা: যেকোনো বিষয়ে ব্যাচেলর/অনার্স ডিগ্রি থাকতে হবে। আইইএলটিএস (IELTS) বাধ্যতামূলক নয়, তবে থাকলে ভালো সুবিধা পাওয়া যায়। ইংরেজির পাশাপাশি ফ্রেঞ্চ বা জার্মান ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান থাকলে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বৃদ্ধি পায়। পূর্বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা থাকা যাবে না।
বিশেষ প্রক্রিয়া: পোর্টালে ইউরোপাস সিভি (Europass CV), অনূদিত ও নোটারাইজড একাডেমিক কাগজপত্র আপলোড করে আবেদন সাবমিট করতে হবে। প্রাথমিক বাছাই বা ‘প্রি-সিলেক্টেড’ হলে প্রার্থীর নিজেকেই বিভিন্ন ইউনিটে ইমেইল করে লবিং/আগ্রহ প্রকাশ করতে হয়। এটিতে সময়সীমা বৃদ্ধির (Extension) কোনো সুযোগ নেই।
সুমন ট্রেনিংশিপ (Schuman Traineeship):
প্রতিষ্ঠান: ইউরোপীয় পার্লামেন্ট।
কর্মস্থল: ব্রাসেলস, লুক্সেমবার্গ অথবা স্ট্রাজবার্গ।
মেয়াদ ও ভাতা: ৫ মাস (পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৮ মাস পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব)। প্রতি মাসে ১,৩০০ ইউরো মান্থলি স্টাইপেন্ড দেওয়া হয়।
গোল্ডেন অপরচুনিটি: পারফরম্যান্স চমৎকার হলে প্রতি বছর ২৫-৩০ জন প্রার্থীকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে স্থায়ী চাকরির অফার প্রদান করা হয়।
যোগ্যতা: ব্যাচেলর ডিগ্রি এবং ইংরেজি ভাষার সাথে ফ্রেঞ্চ/জার্মান ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
ইআইবি ট্রেনিংশিপ (EIB Traineeship):
প্রতিষ্ঠান: ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক।
কর্মস্থল: শুধুমাত্র লুক্সেমবার্গ।
মেয়াদ ও ভাতা: ৩ থেকে ৫ মাস মেয়াদী হলেও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে তা সর্বোচ্চ ১২ মাস (১ বছর) পর্যন্ত বাড়ানো যায়। মাসিক স্টাইপেন্ড ১,৫০০ ইউরো।
টার্গেট ক্ষেত্র: ফিন্যান্স, আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ল’ (আইন), এইচআর ও অ্যাকাউন্টস ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রার্থীদের জন্য এটি সবচেয়ে উপযোগী।
আবেদন প্রক্রিয়া: ইআইবি ক্যারিয়ার পোর্টালে সার্কুলারভিত্তিক পজিশন অ্যানাউন্স করা হয়, তাই পোর্টালে জব অ্যালার্ট অন করে রাখতে হয়।
বাংলাদেশ থেকে ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া ও খরচের হিসাব:
বাংলাদেশিদের জন্য ধাপে ধাপে ভিসা প্রক্রিয়া এবং প্রারম্ভিক বাজেটের একটি স্পষ্ট গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো:
ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া:
ATS প্রাপ্তি: প্রথমে লুক্সেমবার্গ সরকারের কাছ থেকে অনলাইনে ‘এটিএস’ (Temporary Authorization to Stay) সংগ্রহ করতে হবে।
টাইপ-ডি ভিসা: এটিএস হাতে পাওয়ার পর ঢাকায় অবস্থিত সুইডিশ ভিসা সেন্টার(Swedish Visa Center, Dhaka) বা বেলজিয়াম এম্বাসি থেকে টাইপ-ডি (Type-D) ভিসার আবেদন করতে হবে।
রেসিডেন্স পারমিট: লুক্সেমবার্গে পৌঁছানোর ৩ দিনের মধ্যে স্থানীয়ভাবে রেসিডেন্স পারমিটের জন্য আবেদন করতে হবে।
প্রাথমিক আনুমানিক খরচ (সর্বমোট প্রায় ৪ লাখ টাকা):
ভিসা ও বায়োমেট্রিক ফি: প্রায় ৫০ ডলার (৮,০০০ – ১০,০০০ টাকা)।
ফ্লাইট খরচ: ৮০,০০০ – ১,২০,০০০ টাকা।
বাসা ভাড়ার ডিপোজিট: আনুমানিক ১,০০০ ডলার (প্রায় ১.৫ লাখ টাকা)।
প্রথম মাসের বাসা ভাড়া: ৬০০ – ৯০০ ইউরো (৯০,০০০ – ১,৩৫,০০০ টাকা)।
খাবার ও যাতায়াত: প্রায় ৬০,০০০ টাকা (খাবার ২৫০-৩৫০ ইউরো, ট্রান্সপোর্ট ৫০-৮০ ইউরো, অন্যান্য ৮০ ইউরো)।
ট্রেনিংশিপ শেষে ক্যারিয়ার ও স্থায়ী বসবাসের (PR) সম্ভাবনা:
৫ মাসের ট্রেনিংশিপ শেষে প্রার্থীরা যে ৪টি পথ বেছে নিতে পারেন:
প্রোগ্রাম এক্সটেনশন: ইআইবি ট্রেনিংশিপে ১ বছর এবং সুমন ট্রেনিংশিপে ৮ মাস পর্যন্ত কাজের মেয়াদ বাড়ানো যায়।
ওয়ার্ক ভিসা ও পিআর (PR): ট্রেনিংশিপ চলাকালে নেটওয়ার্কিং করে স্থানীয় কোম্পানিতে চাকরি খুঁজে পেলে টাইপ-ডি ভিসাকে সরাসরি ওয়ার্ক ভিসায় রূপান্তর করা যায়। লুক্সেমবার্গে টানা ৫ বছর বৈধভাবে অবস্থান করলে পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি এবং পরবর্তীতে নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব।
উচ্চশিক্ষা/স্টুডেন্ট ভিসা: স্থানীয় চাকরি না পেলে লুক্সেমবার্গ পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে স্টুডেন্ট ভিসায় কনভার্ট করা যায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি প্রতি সেমিস্টারে মাত্র ২৫০ – ৩০০ ইউরো।
বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন: দেশে ফিরে আসলেও ইইউ কমিশন বা পার্লামেন্টের কাজের অভিজ্ঞতা সিভিতে যুক্ত থাকার কারণে দেশীয় শীর্ষ সংস্থায় ক্যারিয়ারের সুযোগ বহুগুণ বেড়ে যায়।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
মার্জিত ইউরোপাস সিভি (Europass CV)।
স্ট্রং ও কাস্টমাইজড মোটিভেশন লেটার (কপি-পেস্ট মুক্ত)।
ইংরেজিতে অনূদিত ও নোটারাইজড ডিগ্রি সার্টিফিকেট ও একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট।
কমপক্ষে ৬ মাসের ভ্যালিডিটি থাকা পাসপোর্ট।
৩ থেকে ৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট (ব্যালেন্স ৪-৫ লাখ টাকা)।
আবেদনে এগিয়ে থাকার জন্য কিছু তথ্য:
অনলাইনে Duolingo অ্যাপের মাধ্যমে ১-২ মাসে ফ্রেঞ্চ বা জার্মান ভাষার প্রাথমিক লেভেল শিখে নেওয়া।
ডেডলাইনের শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা না করে প্রথম দিনেই আবেদন জমা দেওয়া।
ব্লুবুক প্রোগ্রামে প্রি-সিলেক্টেড হলে বিভিন্ন ইউনিটে ইমেইল পাঠিয়ে নিজের আগ্রহ ও যোগ্যতা তুলে ধরা।
সুবিধা ও অসুবিধা:
| সুবিধাসমূহ | অসুবিধা ও চ্যালেঞ্জ |
| • বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশে মাসে ১.৫ লাখ টাকা বেতন। | • অত্যন্ত তীব্র প্রতিযোগিতা (২৪-২৫ হাজার আবেদনের মধ্যে ৬০০-৭০০ সিলেকশন)। |
| • ইউরোপীয় কমিশনের মতো সংস্থায় কাজ করার অনন্য সিভি ভ্যালু। | • প্রাথমিক প্রায় ৪ লাখ টাকার ইনভেস্টমেন্ট প্রয়োজন। |
| • ৫০+ দেশের সহকর্মীদের সাথে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিং। | • নন-ইইউ (Non-EU) নাগরিকদের জন্য সীমিত আসন। |
| • শেনজেনভুক্ত ২৯টি দেশে বিনামূল্যে ভ্রমণের সুযোগ। | • উচ্চ জীবনযাত্রার খরচের কারণে বড় অঙ্কের সঞ্চয় করা যায় না। |
| • ৫ বছর পর স্থায়ী বসবাস (PR) ও সিটিজেনশিপের সুযোগ। | • ভিসা প্রসেসিংয়ে ১-৩ মাস সময় লাগা ও একা থাকার চ্যালেঞ্জ। |
যা অবশ্যই মনে রাখতে হবে:
যাদের জন্য পারফেক্ট: যারা সিভিতে আন্তর্জাতিক এক্সপোজার চান, প্রারম্ভিক ৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে সক্ষম, এবং ট্রেনিংশিপ পরবর্তী অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি সামলানোর সাহস রাখেন।
যাদের জন্য উপযোগী নয়: যারা শুরুতেই পরিবারের সকলকে সাথে নিয়ে যেতে চান, ১০০% গ্যারান্টেড ওয়ার্ক ভিসা চান, কিংবা প্রথম মাস থেকেই বাংলাদেশে ২-৩ লাখ টাকা রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রত্যাশা করেন।
তানজিল আহমেদ জনি/ প্রবাস / ৫ জুন ২০২৬
