জার্মানিতে ফ্রিল্যান্সিং ও নাগরিকত্ব!

ইউরোপে নিজের ক্যারিয়ার গড়া এবং পরিবারের একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। তবে চাকরির স্পন্সরশিপ বা বড় অঙ্কের ব্যাংক ব্যালেন্সের অভাবে সেই স্বপ্ন অনেকেই পূরণ করতে পারেন না। ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, আইইএলটিএস (IELTS) কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির অফার ছাড়াই জার্মানিতে সেটেল হওয়া এখন সম্ভব।

জার্মানির যুগান্তকারী ‘অপরচুনিটি কার্ড’ ও ‘ফ্রিল্যান্সার ভিসা’-র মাধ্যমে উচ্চ আয়ের সুযোগসহ মাত্র ৫ বছরে স্থায়ী রেসিডেন্সি (PR) এবং দ্বৈত পাসপোর্ট অর্জনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন তানজিল আহমেদ জনি।

জার্মানি অপরচুনিটি কার্ড:

জার্মানির নতুন ‘চান্সেনকার্তে’ বা অপরচুনিটি কার্ডের মাধ্যমে কোনো পূর্ব চাকরির অফার ছাড়াই জার্মানিতে গিয়ে ৬ থেকে ১২ মাস থেকে চাকরি খোঁজার সুযোগ পাওয়া যায়। চাকরি খোঁজার পাশাপাশি সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত পার্টটাইম কাজ করার বৈধ অনুমতিও থাকে।

পয়েন্ট সিস্টেম (ন্যূনতম ৬ পয়েন্ট প্রয়োজন):

ব্যাচেলর ডিগ্রি থাকলে: ৪ পয়েন্ট।

৫ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে: ৩ পয়েন্ট।

জার্মানি ভাষা (B1/B2) জানা থাকলে: ২ পয়েন্ট।

বয়স ৩৫ বছরের নিচে হলে: ২ পয়েন্ট।

ভাষা ও ভিসার সফলতার হার: ঢাকা জার্মান দূতাবাসের অভ্যন্তরীণ ডেটা অনুযায়ী, যারা গোয়েথে (Goethe) ভাষা সার্টিফিকেট দিয়ে আবেদন করেছেন তাদের ভিসার সফলতার হার ৯২%, যেখানে শুধু আইইএলটিএস দেওয়া আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৭%।

ব্লকড অ্যাকাউন্ট কৌশল: সাধারণত ১২ মাসের জন্য ১৩,০০০ ইউরো দেখাতে হলেও দূতাবাসের সুযোগ অনুযায়ী মাত্র ৬ মাসের জন্য ৬,৫০০ ইউরো (প্রায় ৮ লাখ টাকা) জমা দেখিয়েও ভিসা পাওয়া সম্ভব।

বিকল্প ১ (আত্মীয়ের স্পন্সরশিপ): জার্মানিতে থাকা কোনো আত্মীয় যদি মাসে কমপক্ষে ১,৪২০ ইউরো আয় করেন, তবে তিনি একটি গ্যারান্টি ডকুমেন্ট (Verpflichtungserklärung) সাইন করে দিলে ব্লকড অ্যাকাউন্ট একেবারেই লাগে না।

বিকল্প ২ (পার্টটাইম চুক্তি): জার্মানি যাওয়ার আগেই কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ২০ ঘণ্টার পার্টটাইম কাজের চুক্তি জোগাড় করতে পারলে ব্লকড অ্যাকাউন্টের প্রয়োজনীয়তা শূন্য হয়ে যায়।

জার্মানি ফ্রিল্যান্সার ভিসা:

নিজের অধীনে স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাইলে জার্মানির ফ্রিল্যান্সার (Freiberufler) ভিসা একটি অনন্য সুযোগ। এর জন্য কোনো কোম্পানি স্পন্সরশিপ বা নিয়োগকর্তার প্রয়োজন হয় না।

কারা আবেদন করতে পারবেন: গ্রাফিক ডিজাইনার, ওয়েব ডেভেলপার, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট, ফটোগ্রাফার, জার্নালিস্ট, শিক্ষক ও শিল্পীদের মতো উদার পেশাজীবীরা (Freie Berufe) এই ভিসার আওতাভুক্ত। এদের ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যবসায়িক কর (Gewerbesteuer) দিতে হয় না।

প্রয়োজনীয় মূল শর্তাবলি:

বিজনেস প্ল্যান: আগামী ৩ বছরের আয়-ব্যয়ের একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা (জার্মান ভাষায় অনুবাদ করা হলে অনুমোদনের সম্ভাবনা বাড়ে)।

জার্মান ক্লায়েন্টের চুক্তি: জার্মান ক্লায়েন্টদের থেকে কাজের চুক্তিপত্র বা ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ (LOI)।

ব্যাংক ব্যালেন্স: ৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্টে অন্তত ১২,০০০ ইউরো (প্রায় ১৭ লাখ টাকা) দেখাতে হয়।

স্বাস্থ্য বীমা ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স: ৩০০ ইউরো কভারেজের হেলথ ইন্স্যুরেন্স এবং বাংলাদেশ পুলিশের ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।

বয়সসীমা সতর্কবার্তা: ৪৫ বছরের বেশি বয়সী আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে আইনি নিয়ম অনুযায়ী ২,৩২,০০০ ইউরো (প্রায় ৩.২৭ কোটি টাকা) মূল্যের রিটায়ারমেন্ট সেভিংস প্রুফ দেখাতে হয়, তাই ৪৫ বছর বয়সের আগেই আবেদন করা বুদ্ধিমানের কাজ।

অ্যানাবিন (Anabin) ডিগ্রি যাচাই ও আবেদন প্রক্রিয়া:

জার্মানিতে আবেদনের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা জার্মান সরকার স্বীকৃত কি না তা অ্যানাবিন (Anabin) ডেটাবেসের মাধ্যমে যাচাই করতে হয়।

এইচ প্লাস (H+): ডিগ্রি সম্পূর্ণ স্বীকৃত হলে সরাসরি আবেদন করা যায়। বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের (BTEB) ২ বছরের পলিটেকনিক ডিপ্লোমা থাকলেও সরাসরি H+ রেটিং পাওয়া যায়।

এইচ মাইনাস (H-): ডিগ্রিতে ঘাটতি থাকলে ‘Anerkennung’ অফিসে মূল্যায়নের আবেদন, রিকগনিশন পার্টনারশিপ, বিনামূল্যে ‘IQ Network’-এর পরামর্শ গ্রহণ, জ্ঞান যাচাই পরীক্ষা (Kenntnisprüfung) অথবা অভিযোজন কোর্সের মাধ্যমে ডিগ্রিকে H+ রেটিংয়ে উন্নীত করা সম্ভব।

আবেদন জমা: ঢাকার গুলশানে VFS Global অফিসে অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সরাসরি বায়োমেট্রিক ও কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এম্বাসি ফি ৭৫ ইউরো এবং VFS সার্ভিস চার্জ প্রায় ৩,৫০০ টাকা। ভিসা প্রসেসিংয়ে সাধারণত ৬ থেকে ১০ সপ্তাহ সময় লাগে।

জার্মানিতে পৌঁছানোর পর প্রাথমিক কাজ ও আয়ের সম্ভাবনা:

জার্মানিতে পৌঁছানোর পর প্রথম ১৪ দিনের মধ্যে কয়েকটি প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়:

Anmeldung: স্থানীয় বুরগ্যাম (Bürgeramt) অফিসে গিয়ে ঠিকানা রেজিস্ট্রেশন করা।

Residence Permit: ফরেনার্স অফিস (Ausländerbehörde) থেকে ফ্রিল্যান্স রেসিডেন্স পারমিট কার্ড নেওয়া।

Tax ID: ট্যাক্স অফিস (Finanzamt) থেকে ট্যাক্স নাম্বার (Steuernummer) সংগ্রহ করা।

অফিস ভাড়ার সাশ্রয়: ফ্রিল্যান্সারদের আলাদা কোনো বাণিজ্যিক অফিস ভাড়া নিতে হয় না; নিজস্ব থাকার বাসাবাড়িকেই অফিশিয়াল বিজনেস অ্যাড্রেস হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

আয়ের সম্ভাবনা ও কর ছাড়: আইটি বা সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে মাসে ৪,০০০ থেকে ৮,০০০ ইউরো এবং গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে ২,৫০০ থেকে ৫,০০০ ইউরো পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। জীবনযাত্রার খরচ বাদ দিয়েও মাসে মোটা অঙ্কের টাকা সঞ্চয় করা যায়। এছাড়া বছরে ১২,৩৪৮ ইউরো পর্যন্ত আয়ের ওপর কোনো ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয় না।

৫ বছরে স্থায়ী রেসিডেন্সি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব:

জার্মানিতে বৈধভাবে কাজ ও কর পরিশোধ করার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে সেটেল হওয়া যায়:

স্থায়ী রেসিডেন্সি: ফ্রিল্যান্সার ভিসা নিয়ে ৫ বছর (অথবা ভাষা ও ট্যাক্স রেকর্ড ভালো হলে দ্রুততম ৩ বছরে) বৈধভাবে থাকলে পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি (PR) পাওয়া যায়। আর অপরচুনিটি কার্ড থেকে আইটি বা হেলথকেয়ারে বার্ষিক ৪৫,৩০০ ইউরো বেতনে ইউ ব্লু কার্ড (EU Blue Card) পেলে মাত্র ৪ বছরেই PR পাওয়া যায়।

দ্বৈত নাগরিকত্ব: ২০২৪ সালের নতুন জার্মান নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, সর্বমোট ৫ বছর জার্মানিতে থাকার পর পাসপোর্ট আবেদন করা যায়। নাগরিকত্ব পরীক্ষায় ৩৩টির মধ্যে ১৭টি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলে (পরীক্ষা ফি ২৫৫ ইউরো) পাসপোর্ট পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বজায় রেখে জার্মান দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণ করা সম্ভব।

তানজিল আহমেদ জনি/ প্রবাস/ ১৮ আগষ্ট ২০২৬

You may also like...