রূপকথার লড়াই থেকে অলিম্পিকের মঞ্চ: বাংলাদেশের ফেন্সিং গল্প
রূপকথা বা লোকগাথার পাতায় ঢাল-তলোয়ারের যুদ্ধ ছিল শক্তির মহড়া। কিন্তু সেই তলোয়ারই যখন জ্যামিতিক নিখুঁত মাপ, সুনির্দিষ্ট কৌশল এবং বৈদ্যুতিক সেন্সরের নিখুঁত হিসাব-নিকাশে বন্দি হয়, তখন তা রূপ নেয় অলিম্পিকের অন্যতম মার্জিত ও আধুনিক খেলা—ফেন্সিংয়ে।
বাংলার হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতি থেকে আন্তর্জাতিক অ্যারেনার অলিম্পিক ট্র্যাক পর্যন্ত বাংলাদেশের ফেন্সিংয়ের যাত্রা এক অনন্য রূপান্তরের ইতিহাস তুলে ধরেছেন তানজিল আহমেদ জনি।
ঐতিহ্যের শিকড়: ঢাল-তলোয়ারের স্মৃতি
বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে অস্ত্র চালনার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ময়মনসিংহ গীতিকার পালা কিংবা রায়বেশে ও লাঠিখেলায় যে শারীরিক কসরত ও তলোয়ারবাজির নান্দনিকতা দেখা যেত, তা মূলত আত্মরক্ষা ও বিনোদনের মাধ্যম ছিল। তবে আধুনিক ক্রীড়া বিশ্বের ফেন্সিংয়ের সাথে এই ঐতিহ্যগত খেলার পার্থক্য অনেক। ফেন্সিং শুধুমাত্র অস্ত্রের ব্যবহার নয়; এটি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কৌশল এবং অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত শারীরিক গতির সমন্বয়।
অ্যাসোসিয়েশনের যাত্রা ও প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেন্সিংয়ের পথচলা খুব বেশি দিনের নয়। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ ফেন্সিং অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হওয়ার পর থেকে এই খেলার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয়। একদম শূন্য থেকে শুরু হওয়া এই খেলায় প্রাথমিক প্রতিবন্ধকতা ছিল প্রচুর:
সরঞ্জামের অপ্রতুলতা: বৈদ্যুতিক পোশাক, বিশেষ ধরনের মাস্ক এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্লেড (ফয়েল, এপি ও সেবার) দেশে প্রস্তুত হতো না।
প্রশিক্ষণের অভাব: আধুনিক ফেন্সিং ট্র্যাকিং ও ট্যাকটিকস শেখানোর মতো বিদেশি কোচ বা অভিজ্ঞ মেন্টরের অভাব ছিল প্রকট।
তবে তরুণ অ্যাথলেটদের একাগ্রতা এবং ক্রীড়া সংগঠকদের প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে খেলাটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, আনসার ও বিকেএসপির মতো সংস্থায় বিস্তার লাভ করে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য ও স্বর্ণজয়ের ইতিহাস
অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশীয় ফেন্সাররা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে শুরু করেন।
এসএ গেমসের সাফল্য: ২০১৯ সালে নেপালের কাঠমান্ডু-পোখরায় অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমসে বাংলাদেশের ফেন্সিং দল তৈরি করে ঐতিহাসিক মাইলফলক। মোট ১১টি পদক (১টি স্বর্ণ, ৩টি রৌপ্য ও ৭টি ব্রোঞ্জ) জয় করে বাংলাদেশ।
ফাতেমা মুজিবের ইতিহাস: সেবার ইভেন্টে ফাতেমা মুজিব বাংলাদেশের হয়ে ফেন্সিংয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক অর্জন করেন, যা দেশের ফেন্সিং ইতিহাসে লাল-সবুজ পতাকাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
অলিম্পিকের স্বপ্ন ও সামনের পথ
অলিম্পিকের সবচেয়ে প্রাচীন এই ইভেন্টে সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। বর্তমানে বাংলাদেশ ফেন্সিং অ্যাসোসিয়েশন ও বিকেএসপি উদীয়মান অ্যাথলেটদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। দেশীয় প্রতিযোগীদের নিয়মিত আন্তর্জাতিক সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও কমনওয়েলথ ফেন্সিং প্রতিযোগিতায় পাঠিয়ে অভিজ্ঞ করে তোলা হচ্ছে।
রূপকথার লোকগাথা থেকে যে ঢাল-তলোয়ারের গল্প শুরু হয়েছিল, আজ তা আধুনিক ফেন্সিংয়ের পিস্তে এসে নতুন আলো ছড়াচ্ছে। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, অবকাঠামো ও ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক এক্সপোজার পেলে অলিম্পিকের মূল মঞ্চেও বাংলাদেশের ফেন্সাররা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হবে।
তানজিল আহমেদ জনি/ ক্রীড়া/ ১৬ জানুয়ারী ২০২৫
