বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের তিরন্দাজির বিস্ময়কর উত্থান
ধনুক থেকে ছুটে যাওয়া একটি তীরের নিশানা শুধু একটি পয়েন্ট বোর্ডে লাগে না, তা ছুয়ে যায় পুরো একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা। গত এক দশকে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে যে কয়েকটি খেলা বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকাকে সবচেয়ে উঁচুতে তুলে ধরেছে, তার মধ্যে আর্চারি বা তিরন্দাজি অন্যতম।
ঐতিহ্যগত সামর্থ্য আর আধুনিক প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে বাংলাদেশে আর্চারি এখন এক সম্ভাবনাময় বিপ্লবের নাম। সেই গল্প তুলে ধরেছেন তানজিল আহমেদ জনি
ঐতিহাসিক রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা
বাংলাদেশে তীর-ধনুকের ব্যবহার নতুন নয়; আমাদের লোকজ ইতিহাস ও উপজাতীয় সংস্কৃতিতে শিকার ও বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ধনুকবিদ্যা দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান ছিল। তবে ২০০০ সালে বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশন গঠিত হওয়ার পর এই ঐতিহ্যবাহী দক্ষতা আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার পেশাদার নিয়মে রূপ নেয়। পর্যাপ্ত বাজেট ও সুবিধার অভাব সত্ত্বেও অ্যাথলেটদের একাগ্রতা খেলাটিকে দ্রুত সামনের দিকে নিয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য ও রোমান সানার বিপ্লব
বাংলাদেশ আর্চারির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দেন দেশের প্রখ্যাত আর্চার রোমান সানা।
নেদারল্যান্ডসে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ (২০১৯): রোমান সানা বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন এবং টোকিও অলিম্পিক ২০২০-এর জন্য সরাসরি কোয়ালিফাই করার ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেন।
আন্তর্জাতিক পদক: এসএ গেমস, এশিয়ান কাপ র্যাঙ্কিং টুর্নামেন্ট এবং ওয়ার্ল্ড কাপে রোমান সানা, দিয়া সিদ্দিকী ও নাসরিন আক্তারদের ধারাবাহিক পদক জয় বাংলাদেশকে এশিয়ার আর্চারির অন্যতম উদীয়মান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশের আর্চারির অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পথে এই মূল দুটি বাধা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
১. উচ্চমূল্যের সরঞ্জাম ও আমদানিনির্ভরতা
আন্তর্জাতিক মানের আর্চারিতে প্রতিযোগীদের ব্যবহৃত ধনুক ও তীর সাধারণ কোনো খেলনা বা সাধারণ মেটেরিয়ালের তৈরি নয়। এগুলো উচ্চমাত্রার প্রযুক্তি ও জ্যামিতিক নিখুঁততার সমন্বয়ে তৈরি।
রিকার্ভ ও কম্পাউন্ড বো-এর আকাশচুম্বী দাম: অলিম্পিক ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ব্যবহৃত একটি মানসম্মত রিকার্ভ বা কম্পাউন্ড বো সেট (Bow Set)-এর দাম সাধারণত ৫,০০০০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০,০০০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই অলিম্পিক-গ্রেড সরঞ্জামগুলোর কার্বন ফাইবার ও রিকয়েল প্রযুক্তি স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা বাংলাদেশে সম্ভব নয়।
ব্যবহারযোগ্য কার্বন অ্যারো : ধনুকের পাশাপাশি কার্বন ও অ্যালুমিনিয়াম অ্যালোয় দিয়ে তৈরি তীর অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আর্চারদের অনুশীলনের সময় প্রায়শই তীর ভেঙে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি একক বিশ্বমানের তীরের দামই কয়েক হাজার টাকা।
শুল্ক ও স্পন্সরশিপের অভাব: বিদেশ থেকে এসব উচ্চমানের সরঞ্জাম আমদানির ওপর উচ্চ কর থাকে। জাতীয় দলের শীর্ষ আর্চারদের বাইরে জেলা বা ক্লাব পর্যায় থেকে নতুন উঠে আসা সম্ভাবনাময় তরুণ অ্যাথলেটদের পক্ষে ব্যক্তিগত খরচে এসব সরঞ্জাম কেনা প্রায় অসম্ভব। স্পন্সরশিপের অভাব এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তোলে।
২. আন্তর্জাতিক কোচ ও পেশাদার অবকাঠামো
একটি নিখুঁত নিশানা অর্জনে শরীর ও মনের ৫০-৫০ শতাংশ অবদান থাকে। উন্নত প্রযুক্তিগত টেকনিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সামলানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার কোচিং ব্যাকআপ এবং আবহাওয়া-বান্ধব ভেন্যু অত্যন্ত জরুরি।
উচ্চমানের দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি কোচ: বিশ্বমানের অ্যাথলেট তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক সার্কিটে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিদেশি কোচ (যেমন কোরিয়া বা ইউরোপের কোচদের) প্রয়োজন। মার্টিন ফ্রেডরিখের মতো কোচের অধীনে বাংলাদেশ সাফল্য পেলেও, ধারাবাহিক উন্নতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়মিত বিদেশি টেকনিক্যাল স্টাফ এবং মেন্টর দরকার, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
ইনডোর আর্চারি রেঞ্জ ও টেকনোলজির অভাব: বাংলাদেশে আর্চারির অধিকাংশ অনুশীলনই উন্মুক্ত মাঠে হয়। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, তীব্র রোদ বা ঝোড়ো বাতাসে আর্চারদের নিশানা অনুশীলন ব্যাহত হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যেকোনো আবহাওয়ায় খেলার মতো মানিয়ে নিতে সব ঋতুতে ব্যবহারের উপযোগী আধুনিক ‘ইনডোর আর্চারি রেঞ্জ’ প্রয়োজন।
স্পোর্টস সায়েন্স ও মানসিক ফিটনেস ল্যাব: আর্চারিতে সামান্য পেশির টান বা স্নায়ুচাপের কারণে অ্যারো লক্ষ্যচ্যুত হতে পারে। অ্যাথলেটদের বায়োমেকানিক্স বিশ্লেষণ, মাসল মেমোরি ডেভেলপমেন্ট এবং হার্ট-রেট নিয়ন্ত্রণের জন্য আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স ও মাইন্ড সেটিং ল্যাব বাংলাদেশে প্রায় নেই বললেই চলে।
৩.ভবিষ্যৎ উত্তরণের সম্ভাবনা
কাস্টমস শুল্ক ছাড়: আর্চারির মতো সম্ভাবনাময় খেলার সরঞ্জাম আমদানিতে বিশেষ কাস্টমস শুল্ক ছাড় বা সরকারি অনুদান সুবিধা বাড়ানো।
স্কুল ও জেলা পর্যায়ে অবকাঠামো: তৃণমূল পর্যায়ে সাশ্রয়ী সরঞ্জাম দিয়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করা এবং বিকেএসপির আর্চারি অ্যাকাডেমিকে আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা।
করপোরেট স্পন্সরশিপ: ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আর্চারদের দীর্ঘমেয়াদে স্পন্সর করলে সরঞ্জাম ও বিদেশি কোচের খরচ বহন করা অনেকটাই সহজ হবে।
আর্চারি এমন একটি খেলা যেখানে শারীরিক শক্তির চেয়ে একাগ্রতা, মানসিক নিয়ন্ত্রণ ও নিশানার নিখুঁত গাণিতিক হিসাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলে অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশের প্রথম পদকটি আর্চারি থেকেই আসা সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
তানজিল আহমেদ জনি/ ক্রীড়া/ ৩১ জানুয়ারী ২০২৫
