বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বাড়ছে রোলার স্কেটিংয়ের জনপ্রিয়তা
কংক্রিটের পিচে চাকার আওয়াজ আর বাতাসের সাথে তরুণদের ছুটে চলা—এই দৃশ্য এখন বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে ক্রমশ পরিচিত হয়ে উঠছে। একটা সময় কেবল টিভি পর্দায় বা বড়লোকের বাচ্চাদের শখের খেলা হিসেবে গণ্য রোলার স্কেটিং, আজ দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ‘আউটডোর অ্যাটিভিটি’ এবং পেশাদার ক্রীড়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
কেবল ঢাকা নয়, এই গতির খেলার ঢেউ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। রোলার স্কেটিংয়ের জনপ্রিয়তার সেই গল্প তুলে ধরেছেন তানজিল আহমেদ জনি।
রূপান্তর: শখ থেকে প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া
গত কয়েক বছরে রোলার স্কেটিংয়ে বাংলাদেশের যাত্রা বিস্ময়কর। একটা সময় রোলার স্কেটিং মানেই ছিল কেবল ব্যালেন্স করার চেষ্টা। আজ তা পরিণত হয়েছে গতি (Speed), শৈলী (Artistic), এবং দলগত দক্ষতার (Roll Ball, Roller Hockey) খেলায়। এই রূপান্তরের পেছনে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ রোলার স্কেটিং ফেডারেশন। ২০১৭ সালে ঢাকায় জাতীয় রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স উদ্বোধনের পর এই খেলাটি এক নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের কেন এত পছন্দ?
রোলার স্কেটিংয়ের এই তুমুল জনপ্রিয়তার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:
রোমাঞ্চ এবং অ্যাডভেঞ্চার: আজকের তরুণরা প্রথাগত খেলার পাশাপাশি রোমাঞ্চ এবং অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করে। রোলার স্কেটিংয়ের গতি এবং বাতাসের সাথে এই ছুটে চলা তাদের সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দেয়।
ফিটনেস ও স্বাস্থ্য: এটি একটি চমৎকার কার্ডিও ব্যায়াম। এটি কেবল শরীরের ব্যালেন্স ঠিক রাখে না, বরং পা, হাঁটু এবং পেশিকে শক্তিশালী করে। তরুণরা এখন স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।
শৈলী ও আত্মপ্রকাশ: এটি এমন একটি খেলা যেখানে ব্যক্তিগত শৈলী ফুটিয়ে তোলার সুযোগ থাকে, বিশেষ করে ‘আর্টিস্টিক’ বা ‘ফ্রি-স্টাইল’ স্কেটিংয়ে। নিজের দক্ষতা এবং স্টাইল প্রদর্শন তরুণদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
সহজলভ্যতা ও কমিউনিটি: গত কয়েক বছরে রোলার স্কেটের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। সেই সাথে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্কেটিং কমিউনিটি বা ক্লাব। তারা নিয়মিত একজোট হয়ে অনুশীলন করে, একে অপরকে শেখায় এবং নতুনদের অনুপ্রাণিত করে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাফল্যের জোয়ার
কেবল জনপ্রিয়তাই বাড়ছে না, বাংলাদেশের স্কেটাররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এখন নিয়মিত উজ্জ্বল পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে। এই তো সেদিন, ২০২৬ সালের আগস্টে চীনে অনুষ্ঠিত এশিয়ান স্পিড ট্র্যাক সিরিজে বাংলাদেশের চার স্কেটার রুপো জিতে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। তারও আগে সাউথ এশিয়ান অ্যাকুয়াটিকস চ্যাম্পিয়নশিপ এবং এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপগুলোতে বাংলাদেশের পদক প্রাপ্তি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেখ রাসেল জাতীয় রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে নিয়মিত জাতীয় এবং বয়সভিত্তিক চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজন সারা দেশ থেকে নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করতে সাহায্য করছে।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এত সম্ভাবনার মাঝেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এখনো আন্তর্জাতিক মানের ট্র্যাক সারা দেশে গড়ে ওঠেনি। তরুণ স্কেটাররা প্রায়শই রাস্তায় বা সাধারণ পার্কে অনুশীলন করতে বাধ্য হয়, যা ঝুঁকিপূর্ণ। প্রয়োজন আরও আধুনিক সরঞ্জাম এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান এই সাফল্যের পেছনে খেলোয়াড়দের একাগ্রতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন।
তিরতির করে বেড়ে ওঠা জনপ্রিয়তার চাকা আজ বাংলাদেশকে বিশ্ব স্কেটিংয়ের মানচিত্রে সম্মানজনক স্থানে নিয়ে এসেছে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পেলে রোলার স্কেটিং থেকে ভবিষ্যতে অলিম্পিক গেমসেও পদক জয়ের স্বপ্ন দেখা অসম্ভব কিছু নয়। এই গতির খেলা কেবল তরুণদের সুস্থ ও সচল রাখছে না, বরং তাদের মধ্যে দলগত স্পিরিট এবং নিয়মানুবর্তিতা তৈরি করছে। কংক্রিটের পিচে তরুণদের এই সোনালী স্বপ্ন ছুটছে, আর বাংলাদেশও এগিয়ে যাচ্ছে গতির সাথে।
তানজিল আহমেদ জনি/ ক্রীড়া/ ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
