৬৪ ঘরের বিপ্লব: বাংলাদেশে দাবার ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
দাবাকে বলা হয় বুদ্ধির লড়াই, মেধা ও কৌশলের এক ক্ল্যাসিক শিল্প রূপ। কালো আর সাদার ৬৪টি ছকবদ্ধ ঘর কেবল একটি বোর্ড নয়, বরং এটি একেকটি নিখুঁত গণিত, মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং অসীম সম্ভাবনার যুদ্ধক্ষেত্র। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচিতি অনেক খেলায় থাকলেও, বুদ্ধিভিত্তিক খেলা হিসেবে দাবায় বাংলাদেশের ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ এবং ঐতিহাসিক।
উপমহাদেশের দাবার মানচিত্রে বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল নাম। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আন্তর্জাতিক গ্র্যান্ডমাস্টারের জন্ম এই মাটিতেই। ঐতিহ্য, অর্জন এবং বর্তমানের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে বাংলাদেশে দাবার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরছেন তানজিল আহমেদ জনি।
ঐতিহ্যের শিকড় ও গ্র্যান্ডমাস্টারদের উত্থান
বাংলাদেশে দাবার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে। তবে ১৯৮০-এর দশক ছিল বাংলাদেশের দাবার স্বর্ণযুগ।
১. নিয়াজ মোর্শেদ ও ঐতিহাসিক অর্জন: ১৯৮৭ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে নিয়াজ মোর্শেদ উপমহাদেশের প্রথম ‘আন্তর্জাতিক গ্র্যান্ডমাস্টার’ (GM) খেতাব অর্জন করে ইতিহাস গড়েছিলেন। তাঁর এই অর্জন পুরো এশিয়ায় বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
২. পাঁচ গ্র্যান্ডমাস্টারের পঞ্চপাণ্ডব: নিয়াজ মোর্শেদের পথ ধরে দেশে উঠে আসেন আরও চারজন দূরদর্শী দাবারু—জিয়াউর রহমান, রিফাত বিন সাত্তার, এনামুল হোসেন রাজীব এবং আবদুল্লাহ আল রাকিব। এই পাঁচ গ্র্যান্ডমাস্টার আন্তর্জাতিক দাবা অলিম্পিয়াড ও বিভিন্ন বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশকে টানা বহু বছর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং লাল-সবুজের পতাকাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানিত করেছেন।
৩. মহিলা দাবার সূচনা: শুধু পুরুষ বিভাগেই নয়, রানী হামিদ ও শামীমা আক্তার এলিজার মতো নারী দাবারুরা আন্তর্জাতিক মাস্টার ও ফিদে মাস্টার খেতাব অর্জন করে দেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনে অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
দাবা খেলার মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক গুরুত্ব
দাবা কেবল ট্রফি বা পদক জয়ের খেলা নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে:
- একাগ্রতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা: দাবা খেলোয়াড়দের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগ, দূরদর্শিতা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে।
- শিক্ষাগত ইতিবাচক প্রভাব: আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত দাবা খেলে, তাদের গাণিতিক ও যৌক্তিক সমস্যা সমাধানের দক্ষতা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি হয়।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা
ঐতিহাসিক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে বাংলাদেশে দাবার অগ্রগতি কিছুটা মন্থর। এর পেছনে প্রধান কিছু কারণ হলো:
- আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও স্পন্সরশিপের অভাব: দাবা একটি ব্যয়বহুল খেলা যখন আন্তর্জাতিক রেটিং ও নর্মস অর্জনের প্রশ্ন আসে। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে প্রচুর অর্থ ও ট্রাভেল ফান্ড প্রয়োজন হয়, যা অধিকাংশ উদীয়মান খেলোয়াড়ের পক্ষে একা বহন করা অসম্ভব।
- গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম অর্জনের সুযোগ কম: দেশে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক মানের (Grandmaster Norm) টুর্নামেন্ট আয়োজন না হওয়ায় তরুণ খেলোয়াড়দের নর্ম অর্জনের জন্য বিদেশে যেতে হয়।
- অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ একাডেমির ঘাটতি: বিশ্বমানের কোচিং ও সুপার গ্র্যান্ডমাস্টারদের অধীনে প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনও অপ্রতুল।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনেক সম্ভাবনাময় ও মেধাবী ক্ষুদে দাবারু উঠে আসছে। তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করে ষষ্ঠ কিংবা সপ্তম গ্র্যান্ডমাস্টার তৈরি করতে হলে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:
১. স্কুল দাবা কার্যক্রম বিস্তার: তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করতে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলার স্কুলগুলোতে দাবাকে পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি একটি নিয়মিত খেলা হিসেবে চালু করা। ২. পেশাদার একাডেমি ও বিদেশি কোচ: বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে আধুনিক ও কম্পিউটারভিত্তিক দাবা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা। ৩. কর্পোরেট স্পন্সরশিপ: ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো দাবাতেও বড় কর্পোরেট হাউসগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে খেলোয়াড়রা জীবিকা নিয়ে চিন্তা না করে খেলাতেই সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন। ৪. অনলাইন দাবার ব্যবহার: বর্তমান ডিজিটাল যুগে Lichess বা Chess.com-এর মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণরা সহজেই বিশ্বের শীর্ষ দাবারুদের সঙ্গে খেলার সুযোগ পাচ্ছে, যা কাজে লাগিয়ে দক্ষতা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
৬৪ ঘরের বোর্ডে চাল দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অতীতে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। পর্যাপ্ত পরিকল্পনা, সরকারি-বেসরকারি সহায়তা এবং উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে দাবার এই বোর্ডে আবারও নতুন বিপ্লব ঘটানো সম্ভব বলে মনে করেন দাবাপ্রেমী ও ক্রীড়া সংশ্লিষ্টজনেরা।
তানজিল আহমেদ জনি/ ক্রীড়া/ ২৪ জানুয়ারী ২০২৫
