স্বল্প খরচে জাপানে চাকরি ও নাগরিকত্ব!

বর্তমানে স্বল্প খরচে জাপানে দক্ষ কর্মী হিসেবে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। ‘ইকিগাই’-এর দেশ জাপানে নার্সিং, কেয়ারগিভিং, কনস্ট্রাকশন ও কৃষিসহ ১৬টি খাতে আগামী কয়েক বছরে লাখ লাখ কর্মী নেওয়া হবে।

সঠিক ভাষা শেখা, স্কিল টেস্ট সম্পন্ন করা এবং সরকারি ও নির্ভরযোগ্য জব পোর্টালে সরাসরি আবেদনের মাধ্যমে আপনি কীভাবে জাপানের স্থায়ী নাগরিকত্ব অর্জন করতে পারবেন সেই বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন তানজিল আহমেদ জনি।

জাপানি সংস্কৃতিতে একটি অনন্য শব্দ প্রচলিত আছে—’ইকিগাই’ (Ikigai), যার অর্থ ‘সকালে ঘুম থেকে ওঠার মূল আনন্দ বা উদ্দেশ্য’। তারা বিশ্বাস করে চেরি ফুলের সৌন্দর্য তীব্র কিন্তু ক্ষণস্থায়ী, তাই তার সৌন্দর্য নষ্ট না করে ধরে রাখতে হয়। এ মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করেই তারা গড়ে তুলেছে পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ, মানবিক ও সুশৃঙ্খল সভ্যতা। তবে তীব্র তরুণ জনগোষ্ঠীর ঘাটতির কারণে দেশটি এখন এক ঐতিহাসিক সংকটের মুখে পড়েছে। ফ্যাক্টরি, খামার ও নার্সিং হোমে কাজের অভাব নেই, কিন্তু তরুণ কর্মী অপ্রতুল।

জাপানে আয়ের সুযোগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি:

জাপান সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে তাদের প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ বিদেশী কর্মী প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে আগামী ৫ বছরেই সুনির্দিষ্ট কিছু খাতে বিশাল চাহিদা তৈরি হয়েছে:

নার্সিং কেয়ার: ১,৩৫,০০০ জন

ম্যানুফ্যাকচারিং/কলকারখানা: ১,৭৩,০০০ জন

কৃষি খাত: ৭৮,০০০ জন

আয়ের হার ও সঞ্চয়: জাপানে একজন কর্মী মাসে গড়ে ১.৫ লক্ষ থেকে ২.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বেতন পেতে পারেন। থাকা-খাওয়ার খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৭০,০০০ থেকে ১.৫ লক্ষটাকা সঞ্চয় করা সম্ভব, যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তুলনায় ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মধ্যপ্রাচ্য থেকে একদিন ফিরে আসতে হলেও জাপানে যোগ্যতা প্রমাণ করে স্থায়ী নাগরিকত্ব লাভ করা সম্ভব।

স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্ব লাভ:

জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রক্রিয়াটি মূলত ৩টি ধাপে বিভক্ত:

প্রথম সিঁড়ি (SSW Type 1): এটি ‘স্পেসিফাইড স্কিলড ওয়ার্কার’ টাইপ-১ ভিসা। এখানে ১৬টি সেক্টরে (কনস্ট্রাকশন, নার্সিং কেয়ার, কৃষি, রেস্টুরেন্ট, ফ্যাক্টরি ইত্যাদি) সর্বোচ্চ ৫ বছর কাজ করা যায়। উচ্চশিক্ষার কড়াকড়ি নেই; শুধু ভাষা ও কাজের দক্ষতা প্রয়োজন।

দ্বিতীয় সিঁড়ি (SSW Type 2): টাইপ-১ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর টাইপ-২ ভিসায় উন্নীত হওয়া যায়। এ ধাপে পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে আসা যায়, অনির্দিষ্টকাল বসবাস করা যায় এবং পারমানেন্ট রেসিডেন্সি (PR)-র আবেদন করা যায়।

তৃতীয় সিঁড়ি (নাগরিকত্ব): পারমানেন্ট রেসিডেন্সি পাওয়ার পর ৫ বছর অবস্থান করলে জাপানের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা সম্ভব। হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ী জাপানের পাসপোর্ট বিশ্বের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, যা দিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রায় সব দেশে ভিসা-মুক্ত ভ্রমণের সুযোগ পাওয়া যায়।

জাপানি ভাষা শেখা ও পরীক্ষা:

জাপানে কাজের ভিসায় যাওয়ার মূল ভিত্তি হলো জাপানি ভাষা। ভাষা শেখার প্রধান মাধ্যমগুলো হলো:

সরকারি বিনামূল্যে কোর্স: বাংলাদেশ সরকারের BMET সেন্টারে দেশের ১২টিরও বেশি স্থানে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ১৬ সপ্তাহের সম্পূর্ণ ফ্রি কোর্স চালু রয়েছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান: ঢাকায় জাপান ফাউন্ডেশন অনুমোদিত ‘জুয়াব’ (JUAB – ফার্মগেট), ১৫টি শাখা সমৃদ্ধ ‘প্যাসিফিক একাডেমি’ (যেখানে প্রায় ১৫,০০০ টাকায় ৩ মাসে N4 কমপ্লিট করা যায়), ব্র্যাক বিআইএল (BRAC BIL), শিল্ড ল্যাঙ্গুয়েজ একাডেমি ও ইউমি জাপান আইটি।

ভাষা পরীক্ষা: প্রতি মাসে অনুষ্ঠিত হওয়া JFT-Basic অথবা সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য JLPT N4 পরীক্ষা দিতে হবে।

N5 (বেসিক কোর্স): সময় লাগে ২-৩ মাস।

N4 (অ্যাডভান্সড কোর্স): সময় লাগে ৩ মাস।

অর্থাৎ মোট ৬ মাসের কঠোর প্রস্তুতিতে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ থেকেই স্কিল টেস্ট:

বর্তমানে বাংলাদেশে ৫টি প্রধান সেক্টরে সরকারি তত্ত্বাবধানে স্কিল টেস্ট দেওয়া যাচ্ছে:

নার্সিং কেয়ার

কনস্ট্রাকশন

কৃষি

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানুফ্যাকচারিং

বিল্ডিং ক্লিনিং (Building Cleaning)

রেজিস্ট্রেশন ও পরীক্ষা: prometric-jp.com ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খুলে টেস্ট সেন্টার ও তারিখ বুক করতে হয়। নমুনা প্রশ্ন পাওয়া যায় সরকারি সাইটে (ssw.go.jp)।

চাকরি খোঁজার পোর্টাল:

নিজে কিংবা ভালো এজেন্টদের মাধ্যমে চাকরি খোঁজার জন্য নিচের সাইটগুলো ভিজিট করা যেতে পারে:

সরকারি ও বিশ্বস্ত ব্রিজিং পোর্টাল:

ssw.go.jp/en (জাপান সরকারের অফিসিয়াল পোর্টাল)

japan.boesl.gov.bd (বোয়েসেল / বাংলাদেশ সরকারি পোর্টাল)

hellowork.mhlw.go.jp (জাপানের শ্রম মন্ত্রণালয়ের সার্ভিস)

আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি জব পোর্টাল:

GaijinPot: ২ লক্ষাধিক ব্যবহারকারীর জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম

Yello Japan: ব্লু কলার ও SSW জবের জন্য বিশেষায়িত

Work Japan, Daijob, CareerCross: দোভাষী ও পেশাদারদের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম

আবেদনের নিয়ম: প্রতিদিন অন্তত ৫ থেকে ১০টি প্রতিষ্ঠানে আলাদা আলাদা কাভার লেটারসহ সিভি/আবেদন পাঠাতে হবে এবং ধৈর্য ধরে ফলোআপ করতে হবে।

ভিসা আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

চাকরির অফার লেটার পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস:

পাসপোর্ট, এনআইডি (NID) ও জন্ম সনদ

পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও শিক্ষা সনদ

ভাষা ও স্কিল টেস্টের সার্টিফিকেট

মেডিকেল রিপোর্ট ও টিবি (TB) টেস্ট

নিয়োগকর্তার অফার লেটার ও কোম্পানির কাগজপত্র

জমা দেওয়ার স্থান: ভিএফএস গ্লোবাল (VFS Global) অথবা ঢাকার বারিধারায় অবস্থিত জাপান দূতাবাসে। প্রসেসিং সময় সাধারণত ৭ থেকে ১০ কার্যদিবস (বা ২ সপ্তাহ)।

আনুমানিক খরচের হিসাব:

খরচের খাতআনুমানিক খরচ (টাকায়)
ভাষা শেখার কোর্স০০ টাকা (BMET) থেকে সর্বোচ্চ ৩০,০০০-৩৫,০০০ টাকা
ভাষা পরীক্ষা ফি৩,৫০০ টাকা
স্কিল টেস্ট ফি১০,০০০ – ২০,০০০ টাকা
পাসপোর্ট, মেডিকেল ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স১৫,০০০ টাকা
জাপান ভিসা ফি০ টাকা (সম্পূর্ণ ফ্রি)
বিমান টিকিট (সরাসরি ফ্লাইট)৬০,০০০ টাকা
বিএমইটি (BMET) ক্লিয়ারেন্স কার্ড১০,০০০ টাকা
সর্বমোট খরচ১,০০,০০০ – ১,৫০,০০০ টাকা

তবে ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকায় জাপান যাওয়ার সুবিধা থাকলেও ভালো পরামর্শকের মাধ্যমে জাপান যাওয়া উচিত। এতে যদি খরচ যদি কিছুটা বেড়েও যায় তার পরেও জাপানের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সহায়ক হয়।

৮ মাসের সম্পূর্ণ রোডম্যাপ:

১ম মাস: পাসপোর্ট তৈরি করুন, BMET বা প্রাইভেট ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সে ভর্তি হন এবং সরকারি পোর্টালে নাম নথিভুক্ত করুন।

৩য় – ৪র্থ মাস: প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা সময় দিয়ে ভাষা চর্চা করে N5 ও N4 কমপ্লিট করুন।

৫ম মাস: JLPT N4 বা JFT-Basic ভাষা পরীক্ষায় অংশ নিন।

৬ষ্ঠ মাস: Prometric সাইটে স্কিল টেস্ট দিয়ে পাস করুন এবং জব পোর্টালগুলোতে প্রোফাইল বানিয়ে প্রতিদিন ৫-১০টি আবেদন পাঠান।

৭ম মাস: অনলাইন ইন্টারভিউ দিন, অফার লেটার সংগ্রহ করুন এবং মেডিকেল ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন করুন।

৮ম মাস: ভিএফএস গ্লোবালে ভিসা জমা দিন, বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নিন, প্লেনের টিকিট কেটে স্বপ্নের দেশ জাপানে উড়াল দিন!

২০২৭ সাল থেকে জাপানের পুরনো ট্রেনিং সিস্টেম পরিবর্তন হয়ে আরও সহজ নতুন নিয়ম চালু হচ্ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ৫,০০০ বাংলাদেশী কর্মী নেওয়ার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সফলতার জন্য ধনকুবের হতে হয় না, প্রয়োজন কেবল সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নিয়মিত অধ্যবসায়। তাই জাপানে গিয়ে নিজের নতুন জীবন গড়তে আজ থেকেই প্রথম পদক্ষেপটি গ্রহণ করা যেতে পারে।

তানজিল আহমেদ জনি/ প্রবাস / ২৫ মে ২০২৬

You may also like...