স্বপ্নের উরুগুয়ে: পরিবার নিয়ে ৩ বছরে স্থায়ী নাগরিকত্ব!

বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, প্রায় শূন্য অপরাধের হার এবং লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে শান্তিময় দেশে পরিবারসহ স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন? বাংলাদেশ থেকেই সঠিক নিয়মে মাত্র ৩ বছরে কীভাবে পাবেন উরুগুয়ের আইনি নাগরিকত্ব ও শক্তিশালী পাসপোর্ট সেই বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন তানজিল আহমেদ জনি।

লাতিন আমেরিকার অন্যতম উন্নত ও শান্তিময় দেশ উরুগুয়ে, যাকে ‘লাতিন আমেরিকার ইউরোপ’ বলা হয়ে থাকে। যেখানে পরিবার নিয়ে মাত্র ৩ বছর বসবাস করলেই মেলে আইনি নাগরিকত্ব, আর সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসা পুরোপুরি বিনামূল্যে বহন করে রাষ্ট্র। এটি কোনো কল্পনা নয়, বরং সঠিক নিয়ম মেনে সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য উরুগুয়ের স্থায়ী নাগরিকত্ব অর্জনের একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তব পথচিত্র।

কেন উরুগুয়ে?

উরুগুয়ে কেন দক্ষিণ আমেরিকার সেরা অভিবাসন গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত, তা দেশটির জীবনযাত্রার মানের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: প্রতিটি অভিবাসী পরিবারের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সন্তানদের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।

উচ্চ সামাজিক নিরাপত্তা: দুর্নীতি প্রায় শূন্যের কোঠায় এবং এটি লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে নিরাপদ ও শান্তিময় রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত।

সহজ আইনি নাগরিকত্ব: পরিবার নিয়ে মাত্র ৩ বছর নিয়মিত বসবাস করলেই স্থায়ী আইনি নাগরিকত্বের আবেদন করা যায়।

উরুগুয়ে নাগরিকত্ব অর্জনের পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া:

নয়া দিল্লি থেকে ভিসা আবেদন

বাংলাদেশে উরুগুয়ের কোনো নিজস্ব দূতাবাস না থাকায়, প্রথম ধাপে ভারতের নয়া দিল্লিতে অবস্থিত উরুগুয়ে কনস্যুলেটের মাধ্যমে ভিসার আবেদন করতে হবে।

আবেদনের সময়সূচি: যাত্রা শুরুর অন্তত ২০ কর্মদিবস আগে অনলাইনে আবেদন করতে হবে।

ভিসা ফি ও মেয়াদ: ভিসা ফি মাত্র ৫৪ ইউএস ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭,০০০ টাকা)। এই ভিসায় উরুগুয়েতে প্রবেশ করে ৯০ দিন থাকা যায়, যা প্রয়োজনে আরও ৯০ দিন বাড়ানো সম্ভব। ভিসাটির সাধারণ মেয়াদ থাকে ১৮০ দিন এবং এটি মাল্টিপল এন্ট্রি সুবিধা প্রদান করে।

পাসপোর্ট ব্যাকগ্রাউন্ড: ফ্রেশ বা একেবারে খালি পাসপোর্টে ভিসা পাওয়া কিছুটা কঠিন হতে পারে। তাই নিরাপদ অভিবাসনের জন্য আগে অন্তত ৩ থেকে ৪টি দেশ ভ্রমণের ইতিহাস তৈরি করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতি:

ভিসা আবেদন ও দেশ ছাড়ার আগেই প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করতে হবে:

প্রয়োজনীয় নথি: অনলাইন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ, জন্ম নিবন্ধন এবং বিয়ের সনদ (নিকাহনামা)।

অ্যাপোস্টাইল ও স্প্যানিশ অনুবাদ: সব নথি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ‘অ্যাপোস্টাইল’ করিয়ে নিতে হবে। উরুগুয়েতে নামার পর সেখানকার সরকারি নিবন্ধিত অনুবাদকের (Traductor Público) মাধ্যমে কাগজপত্রগুলো স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করাতে হবে।

মন্টেভিডিওতে আগমন ও বাসা ভাড়া

উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওতে বিমান ভাড়া সাধারণত রিটার্ন টিকিটসহ ১.৫ থেকে ২ লাখ টাকার মতো পড়ে। উরুগুয়েতে পৌঁছানোর পর প্রথম কাজ হলো স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে একটি বাসা ভাড়া নেওয়া। কারণ সুনির্দিষ্ট আবাসন চুক্তি ছাড়া রেসিডেন্সির আবেদন করা যায় না।

স্বাস্থ্য সনদ (Carné de Salud) ও টিকা গ্রহণ

বাসা ঠিক করার পর স্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ASSE) থেকে হেলথ কার্ড বা ‘কার্নে দি সালুদ’ সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি সেন্টার থেকে বিনামূল্যে টিকা নিয়ে ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট ইস্যু করাতে হবে।

ডিএনএম-এ (DNM) রেসিডেন্সির আবেদন ও আয়ের প্রমাণ

ভিসার মেয়াদ থাকা অবস্থাতেই উরুগুয়ের ইমিগ্রেশন বিভাগে (DNM) স্থায়ী রেসিডেন্সির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হবে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: অ্যাপোস্টাইল ও স্প্যানিশে অনূদিত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, জন্ম ও বিয়ের সনদ, উরুগুয়ের স্বাস্থ্য সনদ এবং ভ্যাকসিন কার্ড।

আয়ের শর্ত: পরিবার নিয়ে বসবাসের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে ন্যূনতম ১,৫০০ ইউএস ডলার নিয়মিত আয়ের সনদ বা ব্যাংক ডকুমেন্টস দেখাতে হবে। এটি স্থানীয় চাকরি, ব্যবসার আয় কিংবা অনলাইন রিমোট ইনকাম হতে পারে। এই আয়ের তথ্য সার্টিফাইড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা নোটারি দিয়ে সত্যায়িত হতে হবে।

আইডি কার্ড (Cédula): রেসিডেন্সি আবেদনের সরকারি ফি ৫৫৭ উরুগুইয়ান পেসো। আবেদন অনুমোদিত হলে জাতীয় পরিচয়পত্র বা ‘সেদুলা’ (Cédula de Identidad) প্রদান করা হয়, যা দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, সিম নেওয়া এবং সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানো যায়।

বসবাস ও ধৈর্যের মেয়াদ:

পরিবারসহ বসবাস করলে ৩ বছর এবং একা থাকলে ৫ বছর দেশটিতে নিয়মিত বসবাস করতে হবে।

শর্তাবলি: একনাগাড়ে ৬ মাসের বেশি উরুগুয়ের বাইরে থাকা যাবে না। ৬ মাসের বেশি বাইরে থাকলে বসবাসের সময়সীমা বা কাউন্টডাউন পুনরায় শূন্য থেকে শুরু হয়।

ইলেকট্রোরাল কোর্টে নাগরিকত্ব লাভ:

৩ বছর পূর্ণ হওয়ার পর ইমিগ্রেশন বিভাগ থেকে মুভমেন্ট রেকর্ড, নিয়মিত জীবিকার প্রমাণ, সামাজিকভাবে সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ (যেমন: সন্তানের স্কুলের রেকর্ড) এবং একজন নিরপেক্ষ সাক্ষী নিয়ে ইলেকট্রোরাল কোর্টে আবেদন করতে হবে। সব পরীক্ষা শেষে দেওয়া হবে উরুগুয়ের আইনি নাগরিকত্বের সনদ বা ‘কার্তা দি সিউদাদানিয়া’ (Carta de Ciudadanía)।

নাগরিকত্ব লাভের পর পাসপোর্টের জন্য অনলাইনে আবেদনের ফি ৫,৩০৭ উরুগুইয়ান পেসো। জরুরি দরকারে ১৭০ পেসো অতিরিক্ত ফি দিয়ে আবেদন করলে ৭২ থেকে ৯৬ কর্মঘণ্টা বা মাত্র ১ সপ্তাহের মধ্যে পাসপোর্ট হাতে পাওয়া যায়।

তানজিল আহমেদ জনি/ প্রবাস / ২ মে ২০২৬

You may also like...