মধ্যপ্রাচ্য নয়, গন্তব্য এবার ফিজি!

মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের দ্বীপরাষ্ট্র ফিজিতে বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য উন্মোচিত হয়েছে এক অপার সম্ভাবনা । মাত্র ১ থেকে ১.১০ লাখ টাকা খরচে সরকারি বা সরাসরি উপায়ে চাকরি এবং পরবর্তীতে স্থায়ী নাগরিকত্ব লাভের বিষয়ৈ বিস্তারিত লিখেছেন তানজিল আহমেদ জনি।

ফিজিতে যাওয়ার ২টি বৈধ মাধ্যম

ফিজিতে কাজের ভিসা নিয়ে যাওয়ার দু’টি অনুমোদিত পথ রয়েছে:

  1. সরকারি পথ (BOESL ও BMET এর মাধ্যমে): বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একমাত্র সরকারি সংস্থা ‘বোয়েসল’ (BOESL)-এর মাধ্যমে যাওয়া। এই মাধ্যমে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের সুযোগ নেই।
  2. সরাসরি আবেদন (Direct Route): ফিজির স্থানীয় জবস পোর্টাল ও ইমিগ্রেশনের দিকনির্দেশনা মেনে সরাসরি নিয়োগকর্তার সাথে যোগাযোগ করে প্রসেসিং সম্পন্ন করা।

ধাপভিত্তিক আবেদন প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

(ক) সরকারি রুটে আবেদনের ধাপসমূহ:

ধাপ ১ (BMET ক্লিয়ারেন্স কার্ড): সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরকারের ওয়েবসাইটে গিয়ে পাসপোর্ট ও এনআইডি দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে এবং নিকটস্থ বিএমইটি অফিসে বায়োমেট্রিক জমা দিয়ে কার্ডটি ডাউনলোড করতে হবে। ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে এই কার্ড থাকা বাধ্যতামূলক।

ধাপ ২ (BOESL নিবন্ধন): বোয়েসলের অফিশিয়াল পোর্টালে (bmsrf.bmes.gov.bd) নিজের ট্রেড স্কিল সার্টিফিকেট ও পাসপোর্টের তথ্য দিয়ে নাম নথিভুক্ত করতে হবে। ফিজির জন্য শেফ, বাস ড্রাইভার, ডিজেল মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান ও পাম্প টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন পদে বোয়েসল হতে সরাসরি সার্কুলার দেওয়া হয়।

ধাপ ৩ (ডিমান্ড লেটার ও মেডিকেল): ফিজির নিয়োগকর্তা ক্যানবেরাস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে সত্যায়িত ডিমান্ড লেটার পাঠাবেন। এরপর আইওএম (IOM) অনুমোদিত সেন্টারে ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা খরচে মেডিকেল করাতে হবে (যার মেয়াদ থাকে ৩ মাস)।

ধাপ ৪ (টিকিট ও ডিপার্চার): ভিসা ও ক্লিয়ারেন্স শেষে ঢাকা থেকে ফিজির রাজধানী সুভা (Suva)-র এয়ার টিকিট কাটতে হবে, যার খরচ সাধারণত ৬০,০০০ থেকে ৯০,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।

সরকারি রুটের সুবিধা: সরকারি মাধ্যমে গেলে নিয়োগকর্তা চুক্তি ভঙ্গ করলে বা বেতন না দিলে ক্যানবেরার বাংলাদেশ হাই কমিশন সরাসরি হস্তক্ষেপ করে আইনি সুরক্ষা প্রদান করে ।

(খ) সরাসরি (Direct) আবেদনের ধাপসমূহ:

ধাপ ১ (জব পোর্টালে প্রোফাইল তৈরি): ফিজির বড় জব সার্চ প্ল্যাটফর্ম myfijijobs.com-এ বিনামূল্যে একাউন্ট খুলে নিজের দক্ষ ট্রেড স্কিল (যেমন: ওয়েলডার, মেকানিক, কনস্ট্রাকশন, শেফ ইত্যাদি) যুক্ত করতে হবে এবং ‘Available for Relocation’ অপশনে ‘Yes’ নির্বাচন করতে হবে।

ধাপ ২ (ফিজি টাইমস ক্লাসিফাইডস): ফিজির জনপ্রিয় পত্রিকা Fiji Times Classifieds (fiji-times.com) এর কনস্ট্রাকশন, টেকনিক্যাল ও হসপিটালিটি সেকশন নিয়মিত দেখতে হবে, যেখানে স্থানীয় নিয়োগকর্তারা সরাসরি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে থাকেন।

ধাপ ৩ (HR-কে সরাসরি ইমেইল প্রেরণ): নিয়োগকর্তার এইচআর (HR) মেইলে নির্দিষ্ট সাবজেক্ট লাইন (যেমন: Application for Welder position – Bangladeshi national ready to relocate) লিখে ইমেইল পাঠাতে হবে।

মেইলে তিনটি বিষয় সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক: ১) স্ক্যান করা ট্রেড সার্টিফিকেট, ২) পাসপোর্টের ১ম পাতার স্ক্যান কপি, এবং ৩) ইংরেজিতে একটি সংক্ষেপিত কভার লেটার।

ধাপ ৪ (ভার্চুয়াল ইন্টারভিউ ও চুক্তি পর্যালোচনা): নিয়োগকর্তা জুম বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ভার্চুয়াল ইন্টারভিউ নেবেন। চুক্তিপত্র (Contract) পাওয়ার পর ৪টি শর্ত ভালোভাবে দেখে নিতে হবে: ১) চাকরির সময়কাল, ২) ফিজিয়ান ডলারে মাসিক বেতন, ৩) আবাসন/হাউজিং সুবিধা, এবং ৪) রিপ্যাট্রিয়েশন (দেশে ফেরার) ক্লজ।

ধাপ ৫ (ওয়ার্ক পারমিট ও ফাইল সাবমিশন): ইন্টারভিউ শেষে নিয়োগকর্তা ফিজিতে আপনার ওয়ার্ক পারমিটের প্রসেস করবেন। আপনাকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স এবং আইওএম মেডিকেল প্রস্তুত রাখতে হবে । সকল কাগজপত্র ইংরেজিতে হতে হবে এবং পারমিটের পুরো মেয়াদ জুড়ে পাসপোর্টের মেয়াদ থাকতে হবে।

সময়সীমা: এই প্রক্রিয়ায় সব মিলিয়ে প্রায় ৪৫ দিন বা দেড় মাসের মধ্যে ফিজিতে পৌঁছানো সম্ভব।

মোট খরচের হিসাব

সঠিক নিয়মে আবেদন করলে ফিজিতে যাওয়ার মোট খরচ বেশ কম:

বিএমইটি কার্ড: সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (৳ ০)।

আইওএম মেডিকেল পরীক্ষা: ৮,০০০ – ১০,০০০ টাকা।

নোটারি খরচ: সর্বোচ্চ ২,০০০ টাকা।

বিমান টিকিট (ঢাকা টু সুভা): ৬০,০০০ – ৯০,০০০ টাকা।

ওয়ার্ক পারমিট ফি: ফিজির নিয়োগকর্তা বহন করবেন।

সর্বমোট আনুমানিক খরচ: প্রায় ১,০০,০০০ থেকে ১,১৫,০০০ টাকা।

বেতন, খরচ ও সঞ্চয়ের সমীকরণ

ফিজিতে সার্কুলার অনুযায়ী নূন্যতম বেতন সাধারণত ৫০০ ফিজিয়ান ডলার বা তার বেশি নির্ধারিত হয়। বিভিন্ন পেশায় সম্ভাব্য আয় ও সঞ্চয়ের হিসাব নিচে তুলে ধরা হলো:

ওয়েলডার: মাসিক আয় ৫০,০০০ – ৫৪,০০০ টাকা। থাকা-খাওয়া বাবদ আনুমানিক ১৫,০০০ টাকা বাদ দিলে মাসে ৩৮,০০০ – ৪০,০০০ টাকা সঞ্চয় করা যায়। ফলে ৩ বছরের চুক্তিতে মোট ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা সঞ্চয় সম্ভব।

মেকানিক: ৩ বছরে মোট সঞ্চয় হতে পারে ১৬ থেকে ১৭ লাখ টাকা।

সিনিয়র ফোরম্যান ও শেফ: ৩ বছরে মোট সঞ্চয় হতে পারে ১৯ থেকে ২০ লাখ টাকা।

পিআর, নাগরিকত্ব ও পরিবারের স্থায়ী ভিসা

ওয়ার্ক পারমিট ও পিআর: প্রথমে ৩ বছরের লং-টার্ম ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া যায়, যা পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে আরও ৩ বছর বাড়ানো সম্ভব (মোট ৬ বছর)। ফিজিতে আইনগতভাবে ৫ বছর বসবাসের পর স্থায়ী আবাসন বা পারমানেন্ট রেসিডেন্সি (PR)-র জন্য আবেদন করা যায়।

নাগরিকত্ব ও দ্বৈত পাসপোর্ট: ১০ বছরের মধ্যে মোট ৫ বছর ফিজিতে অবস্থান করলে নাগরিকত্বের (Citizenship) আবেদন করা যায়। এজন্য ইংরেজি, হিন্দি বা ফিজিয়ান ভাষার যেকোনো একটিতে ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্টে উত্তীর্ণ হতে হয়। ফিজির পাসপোর্ট পেলে আয়ারল্যান্ড, হংকং, রাশিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের প্রায় ৩২টি দেশে ভিসা-মুক্ত ভ্রমণের সুযোগ মেলে। বিশেষ সুবিধা হলো—ফিজি দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন করায় আপনাকে বাংলাদেশী পাসপোর্ট ছাড়তে হবে না।

ফ্যামিলি ভিসা: ওয়ার্ক পারমিটধারী কর্মীরা তাদের স্ত্রী এবং ১৮ বছরের কম বয়সী সন্তানদের ফিজিতে সাথে নিয়ে থাকার জন্য আবেদন করতে পারেন।

বিকল্প ইনভেস্টর পথ ও জরুরি সতর্কতা

ইনভেস্টর পিআর পথ: পর্যাপ্ত ক্যাপিটাল থাকলে ফিজিতে ৫০,০০০ ফিজিয়ান ডলার (প্রায় ২৭ লাখ টাকা) ব্যবসায় বিনিয়োগ করে প্রথমবারই ৩ বছরের সরাসরি পিআর এবং ২,০৫,০০০ ফিজিয়ান ডলার বিনিয়োগে ৭ বছরের সরাসরি পিআর পাওয়া সম্ভব।

অবশ্যই যা মনে রাখতে হবে: ফিজিতে অন-অ্যারাইভাল ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে ভেতরে থেকে ওয়ার্ক পারমিটে রূপান্তর করার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এমনটা করলে আবেদন বাতিলসহ দেশে ফেরত (Deportation) পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। তবে চাইলে কেউ প্রথমে ট্যুরিস্ট ভিসায় ফিজিতে গিয়ে নিয়োগকর্তার সাথে দেখা করে এসে, পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাজে যেতে পারেন।

সঠিক নিয়ম জানা থাকলে ফিজিতে কর্মসংস্থান ও স্থায়ী অভিবাসন মোটেই অসম্ভব কিছু নয়। অল্প খরচে সততা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই আইল্যান্ড রাষ্ট্রে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

তানজিল আহমেদ জনি/ প্রবাস/ ১৭ নভেম্বর ২০২৫

You may also like...