বিনোদনের আড়ালে নীল আগ্রাসন: ভারতীয় ‘সফট পর্ন’ ওটিটির গ্রাসে বাংলাদেশও!
সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস বা শর্টস স্ক্রল করছেন? অজান্তেই কিন্তু পা দিচ্ছেন বিলিয়ন ডলারের সফট পর্ন ইকোসিস্টেমের ভয়াবহ ফাঁদে! সীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় ওটিটি মাফিয়াদের তৈরি এই ‘নীল আগ্রাসন’ আজ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকেও। চতুর অ্যালগরিদম ও বিকৃত সামাজিক ফ্যান্টাসির ছদ্মবেশে কীভাবে আপনার ঘরের সন্তানকে নিশানা করা হচ্ছে, তা তুলে ধরেছেন তানজিল আহমেদ জনি।
আজকের ডিজিটাল যুগে পর্নোগ্রাফি আর কোনো নির্দিষ্ট বা নিষিদ্ধ ওয়েবসাইট বা ভিডিও লিঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন লুকিয়ে আছে সরাসরি আপনার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের নিউজ ফিড বা রিলসের আড়ালে। কল্পনা করুন, একটি ১৩ বছরের শিশু কেবল সময় কাটানোর জন্য বা বিনোদনের উদ্দেশ্যে ইনস্টাগ্রামের রিলস স্ক্রল করছে এবং আচমকাই তার সামনে ভেসে উঠছে একটি আপত্তিকর ও উস্কানিমূলক ভিডিও ক্লিপ। ক্লিপটি শেষ হওয়ার পর স্ক্রিনে ভেসে উঠছে—’সম্পূর্ণ পর্ব দেখতে অ্যাপটি ডাউনলোড করুন’। মাত্র একটি ক্লিকের ব্যবধানেই শুরু হয়ে যাচ্ছে এক অন্ধকার জগতের ফাঁদ। এটিই হলো ভারতের ‘সফট পর্ন ওটিটি ইকোসিস্টেম’, যা সাধারণ পর্নোগ্রাফির চেয়েও বহুগুণ বিপজ্জনক ও আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে।যার আগ্রাসী রুপের স্বীকার বাংলাদেশও।
সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম কোনো ভৌগোলিক সীমানা চেনে না। ভারতে গড়ে ওঠা বিলিয়ন ডলারের সফট পর্ন ওটিটি ইকোসিস্টেমর সাম্রাজ্যের ক্ষতিকর প্রভাব কেবল ভারতের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই; অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও আগ্রাসী উপায়ে তা বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছে। ইনস্টাগ্রাম রিলস, ফেসবুক রিলস এবং ইউটিউব শর্টসের বদৌলতে ভারতীয় এই কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ইকোসিস্টেমের প্রথম ও প্রধান শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ও কিশোর-কিশোরীরা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদমের সীমান্তহীন ফাঁদ
বাংলাদেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী দৈনিক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে সাধারণ রিলস স্ক্রল করার সময় ভারতের উল্টোরথের ওটিটি অ্যাপগুলোর (যেমন: অতরঙ্গি, কাটিং ইত্যাদি) উসকানিমূলক বিজ্ঞাপনী ক্লিপ বা ‘মিড-রোল’ বিজ্ঞাপন সরাসরি চলে আসছে স্থানীয় ব্যবহারকারীদের ফিডে। কৌতূহলবশত কোনো শিশু বা কিশোর যদি সেই ক্লিপে কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় দেয়, মেটার অ্যালগরিদম তাকে সেই ক্যাটাগরির দর্শকের তালিকায় ফেলে দেয়। ফলে বাংলাদেশের ব্যবহারকারীর ফিডও ধীরে ধীরে কুরুচিপূর্ণ কনটেন্টের এক অন্ধকার লুপে আটকে পড়ে।
মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ এবং সম্পর্কের বিকৃতি
এই সফট পর্ন অ্যাপগুলোর ব্যবসা পরিচালনার ধরন অত্যন্ত চতুর। এরা সরাসরি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সাইটের মতো নিজেদের উপস্থাপন করে না, বরং ‘ওয়েব সিরিজ’ বা ‘বিনোদনমূলক ড্রামা’র লেবেল লাগিয়ে অত্যন্ত চতুরভাবে নিজেদের বাজারজাত করে। মানুষের আবেগীয় গল্প বলার আড়ালে এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা পরিস্থিতির মোড়কে অত্যন্ত আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট পরিবেশন করা হয়। এখানে ফ্যান্টাসি বা কল্পনার নাম দিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক সম্পর্ককে স্বাভাবিকীকরণ করে দর্শকের যৌন সুড়সুড়িকে উসকে দেওয়া হয়। যেমন—বাবার সাথে মেয়ের বান্ধবীর সম্পর্ক, মায়ের সাথে ছেলের প্রেমিকার সমকামী সম্পর্ক, গৃহকর্মী, ডাক্তার-রোগী কিংবা শিক্ষক-ছাত্রের মতো পবিত্র সামাজিক সম্পর্কগুলোকে কদর্যভাবে উপস্থাপন করা হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্পর্কের একটি সুনির্দিষ্ট মূল্যবোধ রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় সফট পর্ন অ্যাপগুলোর মূল হাতিয়ারই হলো বিকৃত সম্পর্ককে ফ্যান্টাসির নামে স্বাভাবিকীকরণ করা। অভিভাবক, শিক্ষক, কিংবা নিকট আত্মীয়দের সাথে অনৈতিক ও আপত্তিকর সম্পর্কের যে চটুল চিত্রনাট্য তারা সাজায়, তা দেশের তরুণ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দর্শক যখন এই কৌতূহলোদ্দীপক গল্পের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে, ঠিক তখনই গল্পটি থামিয়ে দেওয়া হয় এবং বাকি অংশ দেখতে অ্যাপ ডাউনলোড করার জন্য সাবক্রিপশন কিনতে বাধ্য করা হয়।
করপোরেট লোভ এবং চলচ্চিত্র জগতের তারকাদের সম্পৃক্ততা
এই নোংরা ব্যবসার পেছনে কোনো সাধারণ বা ছোটখাটো নির্মাতা জড়িত নন; বরং ভারতীয় বিনোদন জগতের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সুপরিচিত ব্যক্তিত্বরা এই নেটওয়ার্কের মূল চালিকাশক্তি। এদের মধ্যে রয়েছেন একতা কাপুর (যিনি ‘অল্ট বালাজি’ অ্যাপ পরিচালনা করতেন), নিবেদিতা বাসু (‘উল্লু’ অ্যাপের কনটেন্ট হেড) এবং রাজ কুন্দ্রার (‘হট শটস’ এর মালিক, যিনি এই ঘটনায় দুই মাস জেলেও কাটিয়েছেন) মতো বড় বড় নাম। বিশেষ করে নিবেদিতা বাসু, যিনি বিগত ২৫ বছর ধরে ‘হাম পাঁচ’, ‘কসৌটি জিন্দেগি কি’, ‘কাহানি ঘর ঘর কি’ বা ‘কিউকি সাস ভি কাভি বহু থি’-এর মতো জনপ্রিয় পারিবারিক ও পরিচ্ছন্ন মেগা সিরিয়ালে ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন, তিনিও এই উল্টোরথে চড়ে উল্লু অ্যাপে যোগ দেন।
এই প্রভাবশালী নির্মাতাদের কারণে শ্বেতা তিওয়ারি, রশ্মি দেশাই, শরদ মালহোত্রা, সুধাংশু পান্ডে, ইকবাল খান এবং শান্তনু মাহেশ্বরীর মতো মূলধারার প্রথম সারির অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে যুক্ত হন। যখন দর্শক দেখেন যে মূলধারার পরিচিত তারকারা এখানে কাজ করছেন, তখন তারা দ্বিধাহীনভাবে অ্যাপগুলো ডাউনলোড ও সাবস্ক্রাইব করেন। পরবর্তীতে এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে কম বাজেটের বি-গ্রেড অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে এসে পুরোপুরি কুরুচিপূর্ণ ও চটুল কনটেন্ট বিক্রি শুরু হয়।
নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার চতুর ‘প্ল্যান বি’
২০২৪ এবং ২০২৫ সালে ভারত সরকার সামাজিক অবক্ষয় রুখতে অল্ট বালাজি, উল্লু, হট শটস, দেশি ফ্লিক্স ও বিএমএক্স-এর মতো ২৫টিরও বেশি কুখ্যাত অ্যাপের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্তু এই ওটিটি মাফিয়ারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে সেই নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। রাজ কুন্দ্রা তো বিতর্কের মাঝেই তার ‘প্ল্যান বি’ হিসেবে ‘বলিফেম’ নামক নতুন অ্যাপ চালুর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন, যা পরে পুলিশ বন্ধ করে দেয়। তবে অন্য অ্যাপগুলো ঠিকই তাদের রূপ পরিবর্তন করেছে ।
অল্ট বালাজি এখন নাম পরিবর্তন করে ‘কাটিং’ নামে নতুন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। একইভাবে, নিষিদ্ধ হওয়া ‘উল্লু’ অ্যাপটি এখন নাম বদলে ‘অতরঙ্গি’ হিসেবে বাজারে সদর্পে রাজত্ব করছে অর্ন্তজালে। এমনকি তাদের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলটি এখনো পুরাতন ‘উল্লু’ নামেই চলছে এবং কনটেন্টের কুরুচিপূর্ণ থাম্বনেইলে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দ্বিমুখী নীতি দেখা যায়, যখন এই কদর্য কনটেন্ট বিক্রেতারা ধর্মের চোল গায়ে জড়ায়। একদিকে রাজ কুন্দ্রা কুরুচিপূর্ণ ব্যবসা চালিয়ে এখন আধ্যাত্মিকতার নাটক করে বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অন্যদিকে যৌন সুড়সুড়িমূলক কনটেন্ট বিক্রি করা উল্লু (বর্তমানে অতরঙ্গি) অ্যাপটি এখন ‘হরি ওম’ নামে একটি ধর্মীয় অ্যাপ চালু করেছে। অর্থাৎ, ঘরের নাতি থেকে শুরু করে ঠাকুমা—পরিবারের প্রতিটি প্রজন্মকে নিশানা করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর নীল নকশা সাজানো হয়েছে।
অ্যালগরিদমের অন্ধকার খেলা
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো বর্তমানে যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক সাইটের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। কারণ প্রাপ্তবয়স্ক সাইটে মানুষ নিজের ইচ্ছায় যায়, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় না চাইতেও এই ধরনের আপত্তিকর কনটেন্ট ব্যবহারকারীর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত অ্যালগরিদমের ওপর ভিত্তি করে চলে, যার একমাত্র লক্ষ্য হলো ‘এনগেজমেন্ট’, ‘ক্লিক রেট’ এবং ‘ওয়াচ টাইম’ বাড়ানো। ব্যবহারকারী কৌতূহলবশত একবার ক্লিক করলেই অ্যালগরিদম তাকে বারবার একই ধরনের কনটেন্ট সাজেস্ট করতে থাকে।
সম্প্রতি বিবিসি-র অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র ‘দ্য কেয়ারলেস মেশিন’ এ মেটার এই ভয়ঙ্কর রূপ উন্মোচন করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, একটি সাধারণ আপত্তিকর ‘মিড-রোল’ বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে একপর্যায়ে ব্যবহারকারীর ফিড এমন সব ভিডিওতে ভরে যায়, যেখানে ৭-৮ বছরের কাঁদছে এমন ছোট শিশুদেরও যৌন উত্তেজক বার্তার সাথে প্রদর্শন করা হচ্ছিল।
মেটার উদাসীনতা
মজার ব্যাপার হলো, মেটার বিজ্ঞাপন নীতিমালা অনুসারে উসকানিমূলক বিজ্ঞাপন চালানো নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে দেখা মেলে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্রের। মেটার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্র্যান্ড বোল্যান্ড ২০২০ সালে মুনাফার জন্য শিশু সুরক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়কে অবহেলা করার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন এবং ২০২৬ সালে মেটার বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেন।
এমনকি আদালতের মুখোমুখি হয়ে মেটা প্রধান মার্ক জুকারবার্গ অত্যন্ত অবাস্তব দাবি করে বলেন যে, কোনো সমস্যাকে লুকিয়ে রাখার চেয়ে সামনে নিয়ে আসা ভালো, যা সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে! একইভাবে, মেটা ইন্ডিয়ার কান্ট্রি হেড অরুণ শ্রীনিবাসকে যখন এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি দায়িত্ব এড়াতে সাংবাদিকদের সামনে থেকে পালিয়ে যান।
অ্যালগরিদম যেভাবে শিশুদের টার্গেট করে
সোশ্যাল মিডিয়ার এআই-চালিত অ্যালগরিদমগুলোর নিজস্ব কোনো নৈতিকতা নেই; এগুলো মূলত এনগেজমেন্ট , ক্লিক রেট এবং ওয়াচ টাইম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। এই অ্যালগরিদমগুলো যেভাবে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বা টার্গেট করে তোলে, তার একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে:
কৌতূহল ও প্রথম ফাঁদ: শিশুরা যখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সাইটে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়াই স্রেফ বিনোদনের জন্য ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে রিলস বা শর্টস স্ক্রল করে, তখন তাদের সামনে হঠাৎ করেই কোনো উসকানিমূলক ‘মিড-রোল’ বিজ্ঞাপন বা ভিডিও ক্লিপ ভেসে ওঠে।
মনোযোগ ও সময় ট্র্যাক করা: মানুষের স্বাভাবিক মনস্তত্ত্বের কারণে শিশুটি যদি কৌতূহলবশত সেই গল্প বা ভিডিওতে সামান্য সময়ও ব্যয় করে, অ্যালগরিদম তাৎক্ষণিকভাবে তা রেকর্ড করে নেয়। শিশুটি পরবর্তীতে ওই অ্যাপ ডাউনলোড করুক বা না করুক, সে যে ওই ভিডিওটিতে একটি উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করেছে—এই তথ্যটি অ্যালগরিদমের কাছে একটি ইতিবাচক সংকেত পাঠায়।
অন্ধকার লুপের সৃষ্টি: এই ওয়াচ টাইমকে ‘ইউজার এনগেজমেন্ট’ হিসেবে ধরে নিয়ে অ্যালগরিদম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিশুটির ফিডে একই ধরনের আরও বেশি আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট সাজেস্ট করতে শুরু করে। ফলে শিশুটি নিজের অজান্তেই একটি অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর চক্রের মধ্যে পড়ে যায়।
অবারিত বাজার এবং নিয়ন্ত্রণের অভাব
ভারতের এই সফট পর্ন মার্কেটটি কতটা বিশাল, তা পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়। ভারতীয় মূলধারার চলচ্চিত্র শিল্প যেখানে প্রতি বছর ২ থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলার আয় করে, সেখানে ভারতীয় প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদন বাজারের মূল্য প্রায় ৭.৯১ বিলিয়ন ডলার। অ্যাডাল্ট কনটেন্ট দেখার ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রয়েছে এবং এই ট্রাফিকের ৯০% আসে স্মার্টফোন থেকে। ২০১৬ সালের পর ইন্টারনেটের সস্তা মূল্য এবং স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এই অবৈধ ব্যবসাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যেহেতু এই ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো সিবিএফসি অর্থাৎ সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনের অধীনে পড়ে না, তাই তারা তথ্য প্রযুক্তি আইন ২০২১ এর সুযোগ নিয়ে নিজেরাই নিজেদের কনটেন্টকে ‘ইউএ ১৩+’, ‘ইউএ ১৬+’ বা ‘এ’ রেটিং দিয়ে সম্পূর্ণ দায় দর্শকের ওপর চাপিয়ে দেয়। এই বিপুল বাজারের সুবাদে শুধুমাত্র ‘উল্লু’ অ্যাপটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ১০০ কোটি (৯৯.৭ কোটি) টাকা রাজস্ব আয় করেছে এবং ২০২৫ সালে তারা ‘উল্লু কয়েন’ নামক নিজস্ব ডিজিটাল কারেন্সি চালুর পাশাপাশি আইপিও আনার পরিকল্পনাও করছিলো।
যতক্ষণ না সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের অ্যালগরিদম ও বিজ্ঞাপনের নৈতিক দায়বদ্ধতা স্বীকার করছে এবং মূলধারার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা সামাজিক মূল্যবোধের স্বার্থে এই কদর্য লোভ পরিহার করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজকে এই আধুনিক নীল আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা অসম্ভব।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অঙ্গনে অনুকরণ ও স্থানীয় ‘সফট পর্ন’ ফাঁদ সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ভারতীয় ওটিটি অ্যাপগুলোর ব্যবসায়িক সাফল্য দেখে বাংলাদেশেও একশ্রেণীর স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অনিয়ন্ত্রিত ওয়েব-প্ল্যাটফর্ম একই মডেল অনুসরণের চেষ্টা করছে। ইউজার এনগেজমেন্ট বাড়াতে এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে দেশীয় ডাবড কনটেন্ট, চটুল নাটকের ক্লিপিং এবং ইঙ্গিতপূর্ণ ‘শর্ট ফিল্ম’ বানিয়ে ফেসবুক ও ইউটিউবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, ভারতীয় প্ল্যাটফর্মগুলোর দেখাদেখি বাংলাদেশেও একটি অপ্রকাশ্য ‘সফট পর্ন’ বাজার তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষকে অ্যাপ ডাউনলোড বা পেইড সাবস্ক্রিপশনের দিকে প্রলুব্ধ করছে।
যৌথ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা ভারত সরকার একাধিকবার এসব অ্যাপের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও তারা নাম বদলে (যেমন: উল্লু থেকে অতরঙ্গি) পুনরায় ফিরছে। বাংলাদেশে এই ধরনের ডিজিটাল সাইবার ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ এখানে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমের ওপর স্থানীয় নজরদারি বা ফিল্টারিং ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
যতক্ষণ না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ওপর কঠোর এআই-ফিল্টারিং নীতি আরোপ করা হচ্ছে এবং স্থানীয়ভাবে সাইবার মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সীমানা পেরিয়ে আসা এই আধুনিক নীল আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশের উঠতি প্রজন্মকে মুক্ত রাখা কঠিন। বিনোদনের ছদ্মবেশে তৈরি এই ডিজিটাল ফাঁদ প্রতিরোধে পারিবারিক সচেতনতার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
তানজিল আহমেদ জনি/ ওটিটি/ বিনোদন/ থার্ড আই/ ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
