৩০-৩৫ লাখ টাকায় সার্বিয়ায় বাড়ি কিনে পরিবারসহ ইউরোপিয়ান রেসিডেন্সি!

দালালদের হাতে জীবনের সব সঞ্চয় তুলে দিয়ে বিপজ্জনক সমুদ্রপথে জীবন বিপন্ন না করে, কীভাবে সম্পূর্ণ আইনি উপায়ে সার্বিয়ায় সাশ্রয়ী দামে প্রপার্টি কিনে পুরো পরিবারসহ ইউরোপিয়ান রেসিডেন্সি ও ৫ বছরে নাগরিকত্ব পাবেন? সেই সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্টের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন তানজিল আহমেদ জনি।

প্রতিবছর বহু বাংলাদেশী ইউরোপের স্বপ্ন নিয়ে দালালদের হাতে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা তুলে দিয়ে লিবিয়া হয়ে উত্তাল সাগরে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নেন। অথচ এই সমপরিমাণ বা তার চেয়েও কম টাকায় বুদ্ধি খরচ করে সম্পূর্ণ আইনি ও সম্মানের সাথে ইউরোপে প্রপার্টি কিনে পরিবারসহ বসবাস করা এবং ৫ বছর পর ইউরোপিয়ান পাসপোর্ট অর্জন করা সম্ভব। সার্বিয়ার “সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট” প্রক্রিয়া তেমনই একটি নিরাপদ ও শতভাগ আইনি সুযোগ।

সার্বিয়া কেন বর্তমানে ইউরোপের সেরা পছন্দ?

ইইউ ক্যান্ডিডেট কান্ট্রি (EU Candidate Country): সার্বিয়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের একটি ক্যান্ডিডেট দেশ, যা আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে ইইউ-এর পূর্ণ সদস্য হতে পারে। ফলে বর্তমানে ১০-১৫ লাখ টাকায় কেনা কোনো প্রপার্টির দাম সার্বিয়া ইইউ সদস্য হওয়ার পর কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কোনো সর্বনিম্ন বিনিয়োগ সীমা (No Minimum Investment) নেই: পর্তুগাল, স্পেন বা গ্রিসের মতো কোটি কোটি টাকার গোল্ডেন ভিসা প্রক্রিয়ার বিপরীতে সার্বিয়ায় প্রপার্টি কেনার ক্ষেত্রে কোনো ন্যূনতম মূল্যের বাধ্যবাধকতা নেই। একটি ছোট বা সাশ্রয়ী বাড়ি কিনলেও রেসিডেন্সি প্রক্রিয়া চালু রাখা সম্ভব।

পুরো পরিবারের বসবাসের সুযোগ: আবেদনকারীর সাথে তার স্ত্রী, ১৮ বছরের কম বয়সী সন্তান এবং এমনকি নির্ভরশীল বৃদ্ধ বাবা-মাও রেসিডেন্সি ও পরবর্তীতে নাগরিকত্ব পেতে পারেন।

কম জীবনযাত্রার খরচ ও নাগরিক সুবিধা: সার্বিয়ায় জীবনযাত্রার খরচ অত্যন্ত সাশ্রয়ী, যা ঢাকার চেয়েও কম হতে পারে এবং মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় পরিবার নিয়ে ভালোভাবে থাকা সম্ভব[4]। রেসিডেন্সি পারমিট পেলে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা এবং সন্তানদের সরকারি স্কুলে নিখরচায় পড়াশোনা করার সুযোগ রয়েছে।

শক্তিশালী পাসপোর্ট: সার্বিয়ান পাসপোর্ট থাকলে বিশ্বের ১৩৫টিরও বেশি দেশে (যেমন: শেনজেন এলাকা, তুরস্ক, রাশিয়া, চীন, ব্রাজিল, দুবাই ইত্যাদি) ভিসা-ফ্রি বা ভিসা-অন-অ্যারাইভাল ভ্রমণ করা যায়। এছাড়া ভবিষ্যতে সার্বিয়া ইইউ-এর অংশ হলে পুরো ইউরোপের প্রায় ২৯টি দেশে স্বাধীনভাবে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রপার্টি বাজেট ও রিয়েল এস্টেট বাজার (২০২৫ সালের শেষ দিকের ডাটা অনুযায়ী):

রাজধানী বেলগ্রেড: ২ বেডরুমের ফ্ল্যাটের দাম প্রায় ৭০,০০০ থেকে ১,২০,০০০ ইউরো (বাংলাদেশি টাকায় ৮৫ লাখ থেকে ১.৫ কোটি টাকা)।

দ্বিতীয় বড় শহর (নোভিসাদ): ২ রুমের ফ্ল্যাট প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০ ইউরো (প্রায় ৬০ থেকে ৮৫ লাখ টাকা)।

ছোট শহর ও গ্রাম (সুবটিকা, ক্রাগুজেভাক, নিশ ইত্যাদি): এখানে ২ থেকে ৩ বেডরুমের পুরো বাড়ি, উঠান ও জমিসহ মাত্র ১৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ ইউরো (প্রায় ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা)-তেই পাওয়া সম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে ১২ লাখ টাকা (১০,০০০ ইউরো)-তেও বাড়ি মেলে, তবে বাড়িটি অবশ্যই বসবাসযোগ্য হতে হবে।

আইনি কড়াকড়ি ও সমাধান (কোম্পানি ফর্মেশন):

বাংলাদেশ সহ বেশ কিছু এশীয় দেশের নাগরিকদের সরাসরি ব্যক্তিগত নামে সার্বিয়ায় জমি বা বাড়ি কেনার ওপর আইনি কড়াকড়ি রয়েছে (রেসিপ্রোসিটি রুল)। তবে এর শতভাগ বৈধ সমাধান হলো সার্বিয়ায় একটি DOO (LLC) বা লিমিটেড কোম্পানি খোলা।

কোম্পানি খোলার খরচ ও সময়: প্রায় ৫০০ থেকে ১,০০০ ইউরো (প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা) খরচে মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনে সার্বিয়ান বিজনেস রেজিস্টার্স এজেন্সিতে (SBRA) কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করা যায়।

প্রসেস: এই কোম্পানির মালিক হিসেবে কোম্পানির নামে বাড়ি কেনা হলে, আবেদনকারী ও তার পরিবার সার্বিয়ায় টেম্পোরারি রেসিডেন্সি পারমিট (TRP) লাভের যোগ্য হন। এই প্রক্রিয়ায় একজন স্থানীয় বিশ্বস্ত লয়ার বা আইনজীবী নিয়োগ করা সবচেয়ে নিরাপদ।

রেসিডেন্সি থেকে পাসপোর্টের রোডম্যাপ:

১. টেম্পোরারি রেসিডেন্সি (TRP): প্রপার্টি কেনার পর প্রথম বছরে টেম্পোরারি রেসিডেন্সি মিলবে, যা প্রতি বছর রিনিউ করতে হয়। শর্ত হলো বছরে অন্তত ১৮৩ দিন (প্রায় ৬ মাস) সার্বিয়ায় অবস্থান করতে হবে।

২. পারমানেন্ট রেসিডেন্সি (PR): ৩ বছর সফলভাবে টেম্পোরারি রেসিডেনসিতে থাকার পর স্থায়ী রেসিডেন্সি বা পিআর-এর জন্য আবেদন করা যায়।

৩. সিটিজেনশিপ ও পাসপোর্ট: ৫ বছর সার্বিয়ায় থাকার পর নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা সম্ভব। এর জন্য মৌলিক সার্বিয়ান ভাষা জ্ঞান (A2 লেভেল), কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড না থাকা এবং আয়ের একটি বৈধ উৎস দেখানো প্রয়োজন।

খরচ ও সময়ের হিসাব:

মোট সময়সীমা: প্রথম ভিজিট থেকে প্রপার্টি নির্বাচন, কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন ও রেসিডেন্সি পারমিট পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় আনুমানিক ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগে।

মোট বাজেট: সস্তায় বাড়ি কেনা (১৫-২৫ লাখ টাকা), কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন (১ লাখ টাকা), লয়ার ও এজেন্ট ফি (১-২ লাখ টাকা) এবং ট্রাভেল/ভিসা খরচ (১-২ লাখ টাকা) সহ সর্বমোট ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার মধ্যেই এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা সম্ভব।

দিল্লি থেকে ভিসা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস:

বাংলাদেশে সার্বিয়ার কোনো এম্বেসি না থাকায় দিল্লির সার্বিয়ান এম্বেসি থেকে টুরিস্ট ভিসা সংগ্রহ করতে হয়। সূত্রে ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় যেসব বিষয়ের কথা বলা হয়েছে:

ইনভাইটেশন লেটার (Invitation Letter): হোটেল থেকে ইনভাইটেশন লেটার নেওয়া যায়, তবে প্রপার্টি দেখার উদ্দেশ্যে সার্বিয়ার কোনো রিয়েল এস্টেট এজেন্টের কাছ থেকে ইনভাইটেশন লেটার নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর।

ব্যাংক স্টেটমেন্ট: আর্থিক স্বচ্ছলতা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাংক স্টেটমেন্ট প্রদর্শন করতে হয়।

ট্রাভেল হিস্ট্রি (ভ্রমণ ইতিহাস): আগে থেকে দুই-তিনটি দেশ ঘোরার রেকর্ড থাকলে ভিসা পাওয়া অনেক সহজ হয়।

সতর্কতা ও বিবেচনাযোগ্য বিষয়:

সার্বিয়ায় বসবাসের ক্ষেত্রে সার্বিয়ান ভাষা জানা আবশ্যক, শীতকালে তাপমাত্রা মাইনাস ৫ থেকে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায় এবং মুসলিম কমিউনিটির আকার কিছুটা ছোট (প্রায় ২-৩%)। তাই কোনো দালালের খপ্পরে না পড়ে সরাসরি টুরিস্ট বা ইনভিটেশন ভিসায় গিয়ে প্রপার্টি নিজের চোখে যাচাই করা, বিশ্বস্ত আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া এবং ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে খরচের পরিমাণ নির্ধারিত থাকে না। তা কিছুটা বৃদ্ধিও পেতে পারে।

তানজিল আহমেদ জনি/ প্রবাস/ অক্টোবর ২০২৫

You may also like...