‘টক্সিক’ এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিন্তু অসামঞ্জস্যপূর্ণ গ্যাংস্টার ড্রামা

আকাঙ্ক্ষার শিখর নাকি শৈল্পিক দ্বন্দ্বে হারিয়ে যাওয়া এক উচ্চাকাঙ্ক্ষা? গীতু মোহনদাসের শৈল্পিক দৃষ্টি আর কন্নড় সুপারস্টার যশের সিগনেচার অ্যাকশন ইমেজের রোমাঞ্চকর মেলবন্ধনে নির্মিত বহু প্রতীক্ষিত ‘টক্সিক: এ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোন-আপস’।

সিনেমাটি মুক্তির পূর্বেই ভক্তদের মনে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করলেও, ৩ ঘণ্টা ১৪ মিনিটের এই সুবিশাল যাত্রায় তারকার আলো আর পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গির টাকরাণো কীভাবে পুরো সিনেমাটিকে এক জটিল ট্র্যাজেডিতে পরিণত করল? তারকাখ্যাতি ও গল্পবলা নিয়ে রিভিউ লিখেছেন তানজিল আহমেদ জনি

কাহিনী সংক্ষেপ

১৯৪৭ সালের পটভূমিতে নির্মিত এই ছবির গল্পটি পর্তুগিজ শাসনাধীন গোয়ার আফিম চোরাচালান ও অপরাধ জগতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। সালভাডোর সিন্ডিকেট এবং দালভায়ি গোষ্ঠীর মধ্যকার বহু পুরোনো এক বিশ্বাসঘাতকতা ও পারিবারিক রক্তক্ষয়ী শত্রুতার গল্প এখানে তুলে ধরা হয়েছে। মূল চরিত্র রায়া (যশ) তার বোন গঙ্গার (নয়নতারা) স্বপ্ন পূরণ করতে এবং গোয়ার অবৈধ ব্যবসার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে চায়। রায়া কেবল বেঁচে থাকতে, জয় করতে এবং পুরোনো হিসাব মেটাতে এখানে এসেছে। সে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পথে সালভাডোরের মেয়ে রেবেকার (তারা সুতারিয়া) সাথে সম্পর্কে জড়ায়। কিন্তু যখন সে সার্কাস কর্মী নাদিয়ার (কিয়ারা আদভানি) প্রেমে পড়ে ঠিক তখনই গল্পের মোড় ঘোরে। ভালোবাসার পরশ রায়াকে হিংস্রতা ও অপরাধের পথ থেকে ফেরাতে চেষ্টা করে। তবে রায়ার জীবনে আসল তোলপাড় শুরু হয় যখন তার নিজের বুনো ছেলে ‘টিকেট’ (যশ অভিনীত দ্বৈত চরিত্র) তার জীবনের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়।

সিনেমার ইতিবাচক দিক

চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন: সিনেমার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো এর শেষ ভাগে এসে রায়ার মনস্তত্ত্ব এবং অপরাধের পর অপরাধবোধের যে অন্বেষণ তার প্রকাশ পাওয়া। তবে যশ এখানে রায়া এবং টিকেট এই দুই ভিন্ন বয়সের চরিত্রে অভিনয় করতে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে বেশ পরিশ্রম করেছেন, তা দৃশ্যমান। বিশেষ করে শান্ত কণ্ঠে রায়ার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং টিকেটের বেপরোয়া রূপটি বেশ আলাদা ছিল।

রক্তসূত্রে গাঁথা পাপ ও আত্মদহনের উপাখ্যান:

নিজের প্রতিচ্ছবি ও অপরাধবোধ: টিকেট কেবল রায়ার আরেকজন সাধারণ প্রতিপক্ষ বা খলনায়ক নয়। সে আসলে রায়ারই এক ধরণের রূপক প্রতিচ্ছবি, যা এই প্রবীণ গ্যাংস্টারকে তার নিজের তৈরি করা হিংস্র জগতের ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি দাঁড় করায়। এখানেই সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক রূপকটি প্রকাশ পায়—”অপরাধবোধ হলো নিজের প্রতিচ্ছবি”। রায়া চাইলেই শত্রুদের ধ্বংস করতে পারে, নতুন সাম্রাজ্য গড়তে পারে কিংবা অতীতকে কবর দিতে পারে; কিন্তু যে মানুষটি এই অপরাধের সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিল, সেই সত্ত্বাকে সে কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। শেষ পর্যন্ত টিকেটের মুখোমুখি হওয়া মানে নিজের সেই অপরাধী সত্ত্বার মুখোমুখি হওয়া, যাকে রায়া কোনোভাবেই গুলি করে মারতে, পেছনে ফেলে পালাতে বা ধ্বংস করতে পারে না।

নায়ক ও খলনায়কের সীমানা মুছে যাওয়া: এই দ্বন্দ্বে দর্শককে কোনো প্রথাগত ‘নায়ক’ বা ‘খলনায়ক’-এর আরামদায়ক সমীকরণ দেওয়া হয়নি। রায়া নিজেই ছবির একপর্যায়ে স্বীকার করে যে তাদের এই গল্পে কোনো সত্যিকারের নায়ক নেই; বরং তারা দুজনেই একে অপরের চোখে খলনায়ক। এই দ্বান্দ্বিক অবস্থান তাদের মানসিক লড়াইকে আরও জটিল করে তোলে।

অতীতের ট্রমা বনাম বর্তমানের সিদ্ধান্ত: টিকেটের সাথে এই মনস্তাত্ত্বিক সংঘর্ষ রায়াকে তার শৈশব, বেদনা ও অপরাধবোধের সেই গলিপথগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় যা সে এতদিন এড়াতে চেয়েছিল। তাদের সংঘাতের মাধ্যমে একটি মনস্তাত্ত্বিক সত্য উন্মোচিত হয়, শৈশবের ট্রমা বা মানসিক আঘাত মানুষের অপরাধের পথ বেছে নেওয়ার পেছনে ব্যাখ্যা হিসেবে দাঁড়াতে পারলেও, তা কোনোভাবেই মানুষের বর্তমানের নৃশংসতাকে ক্ষমা বা বৈধতা দিতে পারে। মানসিক নিয়ন্ত্রণ হারানো হয়তো অনিচ্ছাকৃত হতে পারে, কিন্তু সেই অপরাধের দায় ও পরিণতি বয়ে বেড়ানোর সিদ্ধান্তটি একান্তই নিজের।

সহিংসতার মোহভঙ্গ : বোন গঙ্গার মতো প্রিয়জনদের হারানোর পর রায়া যখন ভেতরে ভেতরে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল এবং অবিরাম হিংস্রতাকে নিজের দ্বিতীয় চামড়া বানিয়ে ফেলেছিল, ঠিক তখনই টিকেটের উগ্র, বেপরোয়া ও বিশৃঙ্খল রূপটি তাকে তার সেই অসাড় সহিংসতা থেকে জাগিয়ে তোলে। টিকেট তাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে বাধ্য করে যে সে আসলে কী ধরণের দানব তৈরি করেছে।

চমৎকার অভিনয়: নয়নতারা বোন গঙ্গার চরিত্রে অত্যন্ত সংযত ও মর্যাদাপূর্ণ অভিনয় করেছেন, যা সিনেমাটিকে একটি আবেগঘন ভিত্তি দেয়। এছাড়া নাদিয়া চরিত্রে কিয়ারা আদভানি এবং মেলিসা চরিত্রে রুক্মিণী বসন্ত অত্যন্ত প্রশংসনীয় অভিনয় করেছেন।

দৃশ্যমান চমৎকারিত্ব : রাজীব রবির সিনেমাটোগ্রাফি ছিল চমৎকার। তিনি গোয়াকে একটি স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার রূপ দিয়েছেন এবং ম্যাকাওয়ের দৃশ্যগুলোকে কৃত্রিম ও নিয়ন-আলোয় ফুটিয়ে তুলেছেন, যা দৃশ্যত দারুণ। ছবির বিশাল সেট, পিরিয়ড ডিটেইলস এবং কস্টিউম ডিজাইন সত্যিই একটি চমৎকার জগত তৈরি করেছে।

সিনেমার নেতিবাচক দিক

দুই চিন্তাধারার দ্বন্দ্ব: পরিচালক গীতু মোহনদাস (যিনি এর আগে ‘লায়ার্স ডাইস’ বা ‘মুথোন’ তৈরি করেছেন) মানুষের নৈতিক দ্বিধা ও মানসিক সহিংসতা দেখাতে চেয়েছেন। অন্যদিকে যশ চেয়েছিলেন তার ‘কেজিএফ’ ইউনিভার্সের মতো একটি মাস-অ্যাকশন হিরো ইমেজ বজায় রাখতে। তবে সিনেমার সংলাপে ও অ্যাকশনে যশের অতি-নাটকীয়তা গীতু মোহনদাসের আসল নাট্যরূপকে গ্রাস করে ফেলেছে।

অত্যধিক এবং ক্লান্তিকর সহিংসতা: ৩ ঘণ্টা ১৪ মিনিটের এই দীর্ঘ সিনেমাটি বন্দুকযুদ্ধ, কুঠার, ছুরি আর বোমার অবিরাম রক্তক্ষয়ী দৃশ্যে ভরা। একটা সময়ের পর এই সহিংসতা কোনো কারণ ছাড়াই পুনরাবৃত্তিমূলক এবং ক্লান্তিকর মনে হয়েছে।

দুর্বল সম্পাদনা ও শব্দ: উজ্জ্বল কুলকার্নির সম্পাদনা ছিল খাপছাড়া। বেশ কিছু দৃশ্য অযথা দীর্ঘায়িত হয়েছে। রবি বসুর-এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক অতিরিক্ত জোরালো এবং কর্কশ ধাতুনির্মিত শব্দের কারণে প্রায়শই অভিনেতাহীন নীরবতার অভাব বোধ করায় এবং আবেগঘন সংলাপকে ছাপিয়ে গেছে।

নারী চরিত্রের অপব্যবহার: নয়নতারা ও কিয়ারা আদভানি কিছুটা সহানুভূতি পেলেও, বাকি নারী চরিত্রগুলো (যেমন হুমা কোরেশি, তারা সুতারিয়া) যশের বীরত্ব প্রকাশের অনুষঙ্গ হিসেবেই রয়ে গেছে এবং তাদের বিকাশের তেমন সুযোগ ছিল না বললেই চলে।

বিষাদ আর রোমাঞ্চের এক মায়াবী সুরকাব্য

রবি বাসরুরের আবহ সংগীত: সিনেমা জুড়েই রবি বাসরুরের আবহ সংগীত বেশ জোরালো ও প্রভাবশালী ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, এই অবিরাম ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড অনেক সময় অভিনেতাদের সংলাপ ও অভিনয়ের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং অভিনয়ের আবেগের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নীরবতার অভাব: সিনেমার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবেগঘন দৃশ্যে যেখানে নীরবতার প্রয়োজন ছিল, সেখানে তা রাখা হয়নি। অভিনেতাদের আবেগ থিতু হওয়ার আগেই ঘন ঘন পারকাশন (ড্রামের জোরালো শব্দ) এবং ধাতব সাউন্ড ইফেক্ট চলে আসায় দৃশ্যগুলোর গভীরতা নষ্ট হয়েছে।

বিশাল মিশ্রর গান: সঙ্গীত পরিচালক বিশাল মিশ্রর গানগুলো কিছু কিছু দৃশ্যে বেশ কার্যকর ছিল। বিশেষ করে, ‘তাবাহি’গানটি সিনেমার রোমান্টিক এবং দুঃখজনক দৃশ্যগুলোতে বেশ গভীর ও আবেগঘন আবহ তৈরি করতে পেরেছে।

চূড়ান্ত রায়

‘টক্সিক’ নিজেকে খলনায়কের গ্লোরিফিকেশনের বিরোধী এক রূপক গল্প হিসেবে দাবি করলেও, আদতে ৩ ঘণ্টা ধরে এটি মূল চরিত্রের বিষাক্ত পৌরুষ ও সহিংসতাকেই লালন করেছে। যদিও সিনেমার শেষের দিকে অপরাধবোধকে নিজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখানোর রূপকটি এবং ট্রামাকে অপরাধের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তটি ছিল চমৎকার। কিন্তু তারপরেও এটি একটি দৃশ্যমান সমৃদ্ধ ও বিশাল বাজেটের ফেয়ারি টেল হলেও, শেষ পর্যন্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্রনাট্য এবং অতিরিক্ত দৈর্ঘ্যের কারণে দর্শকদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়ার গল্প বললেও ভুল হবে না।।

তানজিল আহমেদ জনি/ বিনোদন/ থার্ড আই/ ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

You may also like...