‘কারাতে শুধুই আত্মরক্ষা নয় বরং নিজের জীবন বদলে যাওয়ার দারুণ গল্প।’: সেনসেই মো. লোকমান হোসেন (৪র্থ ড্যান)

অনেকে ভাবেন কারাতে কেবল মারামারির কৌশল। কিন্তু জাতীয় কারাতে কোচ সেনসেই মো. লোকমান হোসেন (৪র্থ ড্যান) মনে করেন, এটি স্বাস্থ্যরক্ষা, মানসিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি এক অন্ধকার জীবনের পথ থেকে নিজেকে দূরে রাখার ঢাল।

ইয়ং জেনারেশন কেন অন্য খেলা ছেড়ে কারাতে বেছে নেবে? কত বয়স থেকে শুরু করা উচিত, আর ক্যারিয়ার হিসেবেই বা এর ভবিষ্যৎ কী? এসব অজানা তথ্য ও ইনসাইড স্টোরি তুলে ধরেছেন তানজিল আহমেদ জনি।

ট্রেন্ডিরিডারডটকম: প্রথমেই জানতে চাই, ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, শুটিং কিংবা আর্চারির মত জনপ্রিয় খেলাগুলো থাকতে আপনি কেন কারাতে নির্বাচন করলেন?

মো. লোকমান হোসেন: কারাতে একদিকে যেমন একটি আন্তর্জাতিক মানের খেলা, অন্যদিকে নিজের সুরক্ষায় সেরা আত্মরক্ষা (সেলফ ডিফেন্স)। বর্তমান সময়ে যেকোনো চিকিৎসকের কাছে গেলেই রোগীর ভিড় উপচে পড়তে দেখা যায়। এর অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা (লাইফস্টাইল)। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সিংহভাগ মানুষ এখন হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইলের স্ক্রিনে আসক্ত। ফলস্বরূপ, অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে আমাদের শরীরে বাসা বাঁধছে ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকিসহ নানা রকম ব্যাধি। এই সমস্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচতে বা মুক্তি পেতে হলে যেকোনো একটি খেলাধুলা বা শারীরিক কসরত বেছে নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আমার কারাতে বেছে নেওয়ার মূল কারণ ছিল, এটি এমন একটি খেলা, যা একদিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং একই সঙ্গে আত্মরক্ষা ও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার কাছে কারাতে শুধুই কোনো আত্মরক্ষার কৌশল নয়, বরং নিজের জীবন বদলে দেওয়ার এক চমৎকার গল্প।

ট্রেন্ডিরিডারডটকম: কারাতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য কোনো বিশেষ বয়সসীমা নির্ধারণ করা রয়েছে কি?

মো. লোকমান হোসেন: আন্তর্জাতিকভাবে কারাতে শেখার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমা নেই। তবে সাধারণত চার বছর বয়স থেকে কোনো শিশুকে যদি কারাতে ক্লাসে ভর্তি করা হয়, তাহলে ছোটবেলা থেকে নিয়মিত চর্চার ফলে একদিকে যেমন তার পেশিশক্তি বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে কারাতের বিভিন্ন স্টাইলেও সে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। এটি পরবর্তীতে তাকে একজন শক্তিশালী ও আদর্শ ক্রীড়াবিদ (স্পোর্টসম্যান) হিসেবে গড়ে তুলতে দারুণ সহায়তা করে। আবার কেউ চাইলে মাঝবয়সে কিংবা চল্লিশ বছর বয়সের পরও কারাতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারেন। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে শিক্ষার্থীর নিজের মনোবল ও ইচ্ছাশক্তির ওপর।

ট্রেন্ডিরিডারডটকম: বিশ্ব কারাতে ফেডারেশনের স্বীকৃত প্রধান চারটি জাপানিজ স্টাইল গুলো যেমন শাতোকান, গো জু রিউ, শিটো রিউ, এবং ওয়াদো রিউ আসলে কি?

মো. লোকমান হোসেন: বিশ্বের কারাতে শৈলী বা জাপানি স্টাইলগুলোর মধ্যে শটোকান (Shotokan) সবচেয়ে জনপ্রিয়। এতে দীর্ঘ ও নিচু স্ট্যান্স (অবস্থান) এবং দূর থেকে শক্তিশালী ও দ্রুত আক্রমণের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। অন্যদিকে, গোজু-রিউ (Goju-Ryu) স্টাইল হচ্ছে নমনীয় ও বৃত্তাকার নড়াচড়া (মুভমেন্ট) এবং শক্তিশালী আঘাতের কৌশলের এক চমৎকার মিশ্রণ, যা কাছাকাছি থেকে লড়াই ও আত্মরক্ষায় বেশ কার্যকরী। আর শিটো-রিউ (Shito-Ryu) স্টাইলে গতি, সুনির্দিষ্ট কৌশল এবং প্রচুর ‘কাতা’ (Kata) অনুশীলনের ওপর জোর দেওয়া হয়; যা মূলত শটোকান ও গোজু-রিউয়ের একটি শক্তিশালী সমন্বয়। এছাড়া, জাপানি জু-জিৎসু (Jiujitsu) এবং কারাতের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে ওয়াদো-রিউ (Wado-Ryu)। এতে প্রতিপক্ষের আক্রমণ সরাসরি না ঠেকিয়ে শরীর এড়িয়ে গিয়ে পাল্টা আক্রমণ করার কৌশলগুলো শেখানো হয়।

ট্রেন্ডিরিডারডটকম: এই চারটির মধ্যে কোন স্টাইল শেখা উচিত?

মো. লোকমান হোসেন: এটি মূলত নির্ভর করে শিক্ষার্থীর নিজের অথবা শিশু শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে তার অভিভাবকদের পছন্দের ওপর।

ট্রেন্ডিরিডারডটকম: বাংলাদেশে কারাতের অবস্থান কোথায়?

মো. লোকমান হোসেন: ফুটবল, ক্রিকেট ও আর্চারির পরেই বাংলাদেশে কারাতের অবস্থান। দেশের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গনে ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো জনপ্রিয় খেলাগুলো বিপুল বাজেট ও প্রচার পেলেও, আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক টুর্নামেন্টে বড় বড় স্বর্ণপদক এবং গৌরব বয়ে আনার ক্ষেত্রে কারাতে অন্যতম সফল ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেছে। বিশেষ করে সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমসে আর্চারি ও শুটিংয়ের পাশাপাশি কারাতে বাংলাদেশের পদক তালিকার শীর্ষস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৯ সালের নেপাল এসএ গেমসে বাংলাদেশের রেকর্ড ১৯টি স্বর্ণের মধ্যে কারাতে একাই ৩টি স্বর্ণপদক এবং ২০১০ সালের ঢাকা এসএ গেমসে ৪টি স্বর্ণপদক নিজেদের ঘরে তুলেছিল।

ট্রেন্ডিরিডারডটকম: নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস নিয়ে আপনার প্রত্যাশা ও মূল্যায়ন জানতে চাই

মো. লোকমান হোসেন: উপজেলা থেকে শুরু করে জেলা ও জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় গ্রামীণ ও মফস্বলের মেধাবী কিশোর-কিশোরীদের জন্য সহজে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এই প্ল্যাটফর্ম। এটি বর্তমান সরকারের নতুন প্রজন্মের ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য অত্যন্ত যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ তৈরির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।

ট্রেন্ডিরিডারডটকম: বর্তমান প্রেক্ষাপটে খেলাধুলায় ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কি উচিত?

মো. লোকমান হোসেন: আমরা অনেকেই সরকারি চাকরির পেছনে অন্ধের মতো ছুটে বেড়াই। কিন্তু অন্যদিকে, যারা যেকোনো ধরনের খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তারা একটু ভালো পারফর্ম করতে পারলেই বিভিন্ন বাহিনী তাদের লুফে নেয়। এখনো বিভিন্ন বাহিনীতে দক্ষ খেলোয়াড়দের প্রচুর চাহিদা রয়েছে এবং তারা সবসময় প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের চাকরির সুযোগ দেওয়ার জন্য খুঁজে বেড়ায়। তা ছাড়া, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাও নিয়মিত ভালো খেলোয়াড়দের খোঁজে থাকে। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে ‘জেন-জি’ যদি চাকরির এই ইঁদুরদৌড়ে শামিল না হয়ে যেকোনো ক্রীড়াশাখায় নিজেকে একজন দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ করতে পারে, তবে কেবল ভালো চাকরিই নয়, বিশ্বের যেকোনো দেশে উন্নত জীবন ও ক্যারিয়ার গড়ার দারুণ সুযোগ রয়েছে।

ট্রেন্ডিরিডারডটকম: এত দিন আপনি সপ্তাহে কেবল শুক্রবার ও শনিবার সকালে এনএসসিতে (জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ) প্রশিক্ষণ দিলেও, এখন সপ্তাহে চার দিন বিকেলে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?

মো. লোকমান হোসেন: আসলে একজন খেলোয়াড়ের প্রতিদিন অনুশীলন করা প্রয়োজন। একটি হাঁড়িতে যতক্ষণ চুলার আগুন দিয়ে তাপ দেওয়া হবে, হাঁড়ির পানি ততক্ষণই গরম থাকবে। কিন্তু চুলার আগুন বন্ধ করে দেওয়া হলে, ধীরে ধীরে হাঁড়ির পানি ঠান্ডা হয়ে যায়। সেই দৃষ্টিকোণ এবং নিজের পর্যবেক্ষণ থেকে আমি দেখলাম, সপ্তাহে মাত্র দুই দিন কারাতে অনুশীলন করে শিক্ষার্থীরা খুব বেশি সুফল পাবে না। তাই আমি সপ্তাহে চার দিন—শুক্রবার, শনিবার, রোববার ও মঙ্গলবার বিকেলে অনুশীলন করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর ফলে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আমার শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকেই ভালোভাবে কারাতে শিখে একজন দক্ষ খেলোয়াড়, প্রশিক্ষক কিংবা সফল সংগঠক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।

ট্রেন্ডিরিডারডটকম:কারাতে ক্লাবগুলোতে প্রচুর শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও বেশিরভাগ ঝরে যায় কেন?

মো. লোকমান হোসেন: এ ক্ষেত্রে ক্লাবগুলোর, বিশেষ করে সেনসেইদের তেমন কিছু করার থাকে না। কারণ, এখানে সবাই নিজস্ব অর্থ বা ফি দিয়েই শেখে। দেখা যায়, অনেকে ছয় মাস বা এক বছর শেখার পর অন্য কোনো খেলায় চলে যায়। শেষ পর্যন্ত শুধু কারাতে নয়, বরং যেকোনো ক্রীড়াশাখায় টিকে থাকা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টার ওপর। এখানে একজন কোচ কিংবা সেনসেই কেবল অনুপ্রেরণা ও সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন; কিন্তু শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকেও ইতিবাচক মানসিকতা ও একাগ্রতা থাকা জরুরি।

ট্রেন্ডিরিডারডটকম:  কারাতে ক্লাবগুলোতে কি সেনসেইদের নেপাটিজম কাজ করে?

মো. লোকমান হোসেন: সকল সেনসেইয়ের মূল উদ্দেশ্য থাকে তাঁর ছাত্ররা যেন খুব ভালোভাবে কারাতে শেখে এবং তাঁর ক্লাব ও দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনে। প্রত্যেক সেনসেই-ই জানেন যে তিনি সারা জীবন কারাতে অঙ্গনে সক্রিয় থাকবেন না; তাই তিনি সবসময় চান তাঁর স্থানে তাঁর এক বা একাধিক ছাত্র উঠে আসুক, তাঁর ঐতিহ্য বা ধারা ধরে রাখুক। কারাতে প্রশিক্ষণে স্বজনপ্রীতির (নেপোটিজম) কোনো স্থান নেই।

ট্রেন্ডিরিডারডটকম: যারা নতুন কারাতে শিখছে, তাদের জন্য আপনার কী পরামর্শ রয়েছে?

মো. লোকমান হোসেন: ভালোমতো কারাতে শিখে একজন দক্ষ কারাতেকা হওয়ার পাশাপাশি একজন সহৃদয় মানুষ হওয়া সম্ভব; একই সঙ্গে গড়ে ওঠা যায় একজন আদর্শ কোচ ও সফল সংগঠক হিসেবে। বর্তমানে যারা কারাতে শিখছে—তারা জাপানি যেকোনো স্টাইলই অনুশীলন করুক না কেন—আমার প্রত্যাশা তারা প্রত্যেকে ব্যক্তিজীবনে এক-একজন আদর্শ কারাতেকা হয়ে উঠুক এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জন্য গৌরব ও সম্মান বয়ে আনুক।

ছবি সংগ্রহ : ফেইসবুক
তানজিল আহমেদ জনি/ ক্রীড়া/ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

You may also like...