শৈশবের বিলুপ্ত প্রায় ৮টি ঐতিহ্যবাহী খেলা

সন্ধ্যা নামার ঠিক আগের মুহূর্তটি ছিল এক অদ্ভুত রূপকথার মতো। সূর্যাস্তের লাল আভা যখন তালগাছের মাথার ওপর এসে পড়ত, তখন গ্রামের মেঠো পথ, ফাঁকা ধানক্ষেত কিংবা বটতলার উঠানজুড়ে নেমে আসত এক প্রাণবন্ত ব্যস্ততা। ধুলোবালি ওড়া বাতাসে ভেসে আসত তীব্র হাঁকডাক, শিশুদের খিলখিল হাসি আর নিজেদের পছন্দের খেলায় মেতে উঠতো সবাই।

আজ সেই অনাবিল আনন্দের ছবিটা বদলে গেছে। বাঙালির হাজার বছরের এই ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়াসংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া তেমনই ঐতিহ্যবাহী ৮টি খেলা, তাদের অতীত গৌরব, খেলার ধরন এবং হারিয়ে যাওয়ার পেছনের আড়ালের গল্পগুলো তুলে ধরেছেন তানজিল আহমেদ জনি

১. দাঁড়িয়াবান্দা: সীমানা পাহারা ও কৌশলের মহাসমর

একটি আয়তাকার জমিকে কয়েকটি সমান ঘরে ভাগ করে প্রতিটি রেখায় একজন করে ‘কোটদার’ বা রক্ষী দাঁড়িয়ে থাকত। প্রতিপক্ষের মূল লক্ষ্য ছিল রক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এবং তাদের স্পর্শ এড়িয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়া এবং শেষ ঘর ঘুরে আবার আগের ঘরে অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসা।

এটি ছিল কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার খেলা। শারীরিক শক্তির চেয়ে চালবাজি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখার অভ্যাস গড়ে উঠত এই খেলার মাধ্যমে।

দাঁড়িয়াবান্দা খেলার জন্য যে নির্দিষ্ট আয়তনের সমতল মাঠের প্রয়োজন হতো, তা গ্রাম বাংলায় এখন আর নেই। ইট-কনক্রিটের দালানকোঠা বৃদ্ধি পাওয়া এবং মোবাইল গেমসের আগ্রাসনে নতুন প্রজন্ম এই খেলার কঠিন কিন্তু আনন্দদায়ক নিয়মগুলোই ভুলতে বসেছে।

২. গোল্লাছুট: মুক্ত আকাশের নিচে স্বাধীনতার আনন্দ

 ‘গোল্লা’ অর্থাৎ কেন্দ্রবিন্দু। একটি কাঠের খুঁটি বা গর্তকে কেন্দ্র করে খেলাটি আবর্তিত হতো। কেন্দ্রীয় খেলোয়াড় বা ‘রাজা’ গোল্লা আঁকড়ে ধরে রাখতেন, আর দলের অন্য সদস্যরা একে একে রাজাকে ছুঁয়ে দৌড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট দূরের ‘টেক’ বা লক্ষ্যবস্তু ছুঁতে চাইতেন। বিপরীত দলের কাজ ছিল তাদের মাঝপথে ছুঁয়ে ফেলে বাদ দেওয়া।

এটি মূলত দৌড় ও গতির খেলা। মুক্ত বাতাসে ফুসফুস ভরে শ্বাস নেওয়ার এবং দ্রুত গতির সাথে শরীরের ভারসাম্য সামলানোর দারুণ সুযোগ তৈরি করত গোল্লাছুট।

এই খেলার জন্য বেশ বড় ফাঁকা জায়গার প্রয়োজন হয়। গ্রামীণ জমিতে অতিরিক্ত বসতি স্থাপন এবং বাণিজ্যিক চাষাবাদের ফলে মুক্ত মাঠ কমে যাওয়ায় এই খেলার চল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

৩. কানামাছি: অন্ধবিশ্বাসের মাঝেও স্পর্শের ম্যাজিক

“কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাকে ছোঁ”—এই মিষ্টি ছড়াটি একসময় সবার মুখে মুখে ফিরত। খেলায় একজনের চোখ গামছা বা কাপড়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হতো, সে হতো ‘কানামাছি’। বাকিরা তার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ছড়া কাটত এবং তাকে হালকা ছুঁয়ে পালিয়ে যেত। কানামাছিকে অন্য যেকোনো একজনকে ধরে নাম বলতে হতো।

শ্রবণশক্তি, স্পর্শ অনুভূতি এবং মানুষের কণ্ঠস্বর বা নড়াচড়া চিনতে পারার মানসিক দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেত। ছোট শিশুদের সামাজিক মেলামেশার এটি ছিল দারুণ এক মাধ্যম।

চোখ বেঁধে খেলার মতো মেঠো ও নিরাপদ পরিবেশ এখন আর শহরের তো বটেই, গ্রামের শিশুদেরও নেই। কানামাছি আজ কেবল শিশুতোষ ছড়ার বইয়ে রঙিন ছবি হয়ে টিকে রয়েছে।

৪. ডাংগুলি: দুরন্ত শৈশবের ‘ছোট ক্রিকেট’

একটি বড় লাঠি (ডাং) আর দুই মুখ ছুঁচলো ছোট একটি কাঠের টুকরো (গুলি)—এই ছিল এর মূল সরঞ্জাম। ছোট টুকরোটিকে মাটিতে বানানো একটি ছোট গর্তে রেখে লাঠি দিয়ে উঁচিয়ে শূন্যে পাঠাতে হতো, তারপর বাতাসে থাকা অবস্থাতেই লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করে পাঠাতে হতো দূরে। প্রতিপক্ষ গুলিটি ক্যাচ ধরলে আউট, না পারলে দূরত্ব মেপে পয়েন্ট হিসাব হতো।

গতি, দূরদর্শিতা ও চোখ-হাতের চমৎকার সমন্বয় (Hand-eye coordination) বাড়ানোর দারুণ মাধ্যম ছিল ডাংগুলি। অনেকেই একে আজকের ক্রিকেটের গ্রামীণ আদি রূপ বলে থাকেন।

ছুঁচলো কাঠের গুলি চোখে লেগে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকায় অভিভাবকরা শিশুদের এটি খেলতে বারন করতেন। তাছাড়া প্লাস্টিক ও কাঠের ক্রিকেট বল-ব্যাটের সহজলভ্যতায় ডাংগুলি এখন অতীত।

৫. বউচি: কৌশল ও স্বাধীনতার লড়াই

খেলার ধরন: একটি ছোট ঘরে একজন খেলোয়াড় ‘বউ’ হিসেবে বন্দি থাকতেন। তাকে মুক্ত করাই ছিল অন্য সহকারীদের লক্ষ্য। মাঝখানে পাহারা দিত প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা। আক্রমণের দল এক নিঃশ্বাসে দম ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ছুঁয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত, যাতে সুযোগ বুঝে ‘বউ’ দৌড়ে এসে নিজ দলে মিশতে পারে।

মেয়েদের ও শিশুদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই খেলাটি সামাজিক মেলবন্ধন, দলগত পরিকল্পনা এবং শারীরিক চপলতা বৃদ্ধি করত।

গ্রামীণ সামাজিক কাঠামো বদলে যাওয়া এবং বিনোদনের সহজ মাধ্যম হিসেবে মোবাইল ভিডিও ও টেলিভিশন বেছে নেওয়ায় বউচির মতো প্রাণবন্ত খেলায় এখন আর কেউ মেতে ওঠে না।

৬. এক্কা-দোক্কা: ইটের ছাল আর চারকোনা ঘরের খেলা

মাটিতে দাগ কেটে ৬টি বা ৮টি চারকোনা ঘর বানানো হতো। তারপর চাড়া (মাটির পাতিল বা ইটের চ্যাপ্টা টুকরো) নির্দিষ্ট ঘরে ছুঁড়ে ফেলে এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে দাগ না ছুঁয়ে সেই চাড়া আবার কুড়িয়ে নিয়ে ফিরে আসতে হতো।

শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা, গভীর মনোযোগ দেওয়া এবং লক্ষ্য সঠিক রাখার জন্য এক্কা-দোক্কা ছিল আদর্শ খেলা। প্রধানত গ্রামের মেয়েরাই এই খেলায় বেশি অংশ নিত।

কাঁচা উঠানের অভাব এবং সর্বত্র ইট-সিমেন্টের পাকা মেঝের বিস্তারের কারণে এক্কা-দোক্কা খেলার প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে।

৭. মার্বেল খেলা: কাঁচের গুটিতে নিখুঁত নিশানা

রঙিন কাঁচের মার্বেল গুটি নিয়ে মাটিতে ছোট গর্ত খুঁড়ে খেলাটি শুরু হতো। হাতের মধ্যমা আঙুল দিয়ে বিশেষ কায়দায় নিখুঁত নিশানায় অন্য মার্বেলকে আঘাত করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। আঘাত করতে পারলে প্রতিপক্ষের সেই মার্বেলটি বিজয়ী খেলোয়াড় নিজের করে নিত।

এটি ছিল সূক্ষ্ম নিশানা, একাগ্রতা এবং ধৈর্য পরীক্ষার এক অসাধারণ খেলা।

মার্বেল খেলাকে একসময় ‘জুয়া’ বা ‘বাজে ছেলেদের কাজ’ আখ্যা দিয়ে অভিভাবকরা নিরুৎসাহিত করতেন। বর্তমানে ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিন টাচ গেমসের দাপটে নিশানার এই খেলা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।

৮. ষোল গুটি: বারান্দার অলস দুপুরে বুদ্ধির দাবা

বৃষ্টির দিনে কিংবা তপ্ত অলস দুপুরে বাড়ির বারান্দায় বা চাটাইয়ের ওপর কোট কেটে খেলা হতো ষোল গুটি। দুই দলের ১৬টি করে মোট ৩২টি গুটি থাকত। চাল দিয়ে প্রতিপক্ষের গুটির ওপর দিয়ে লাফিয়ে গিয়ে সেই গুটি কেটে নেওয়াই ছিল খেলার কৌশল।

এটি বাংলার নিজস্ব ‘দাবা’। মানসিক তীক্ষ্ণতা, প্রতিপক্ষের চাল বোঝার ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার দক্ষতা বাড়াত এই খেলা।

লুডু, ক্যারাম কিংবা মোবাইলের ই-স্পোর্টসের কাছে হেরে গেছে মাটির বা পাথরের ষোল গুটি। প্রবীণদের চণ্ডীমণ্ডপ বা বারান্দার সেই আড্ডাও আর নেই, ষোল গুটির চালও আজ স্তব্ধ।

ঐতিহ্য ফেরানোর দায়বদ্ধতা

ক্রীড়া সংস্কৃতির এই বিলুপ্তি কেবল কয়েকটি খেলার হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং বাঙালির ঐতিহ্য ও শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক অশনি সংকেত। এখনই সময় এই ঐতিহ্যগুলোকে বাঁচিয়ে তোলার। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, বিদ্যালয় পর্যায় এবং স্থানীয় ক্লাবগুলোর উদ্যোগে এই গ্রামীণ খেলাগুলোর বার্ষিক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা উচিত। ‘জাতীয় গ্রামীণ ক্রীড়া উৎসব’ আয়োজন করে নতুন প্রজন্মের কাছে এগুলোর নিয়ম ও গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। পার্ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাধুলার জন্য নির্দিষ্ট স্থান সংরক্ষণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

তানজিল আহমেদ জনি/ ক্রীড়া/ ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

You may also like...