১০ হাজার টাকায় ইউরোপ: স্লোভেনিয়া ওয়ার্ক পারমিট!
আইইএলটিএস পরীক্ষা, কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স ছাড়াই মাত্র ১০,০০০ টাকা ভিসা ফি দিয়ে স্লোভেনিয়ায় পৌঁছানোর উপায়, ন্যূনতম ১,৩২,০০০ টাকা বেতনে কাজ শুরু করে নিজেই সরকারি পোর্টালে আবেদন করার নিয়ম এবং ৫ বছরে স্থায়ী রেসিডেন্সি লাভ করার বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন তানজিল আহমেদ জনি।
স্লোভেনিয়া পরিচিতি ও বর্তমান শ্রমবাজার
স্লোভেনিয়া হলো সেন্ট্রাল ইউরোপের আল্পস পাহাড়, তুষারাবৃত হ্রদ ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা একটি অত্যন্ত নিরাপদ ও শান্তিময় দেশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং সেনজেন জোনের অন্তর্ভুক্ত। মাত্র ২১ লাখ জনসংখ্যার এই দেশটিতে বর্তমানে তীব্র শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে দেশটির সরকার বিদেশি কর্মী দ্রুত নিয়োগের জন্য বিশেষ ও সহজ অভিবাসন নিয়ম চালু করেছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মধ্যস্বত্বভোগী বা এজেন্টের কাছে প্রতারিত না হয়ে প্রার্থীরা বাংলাদেশ থেকেই সরকারি পোর্টালে সরাসরি চাকরির জন্য আবেদন করা যায়।
কেন স্লোভেনিয়া বেছে নেবেন?
আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো: স্লোভেনিয়ায় ন্যূনতম মান্থলি গ্রস বেতন ১,৪৮১ ইউরো, ট্যাক্স ও সামাজিক নিরাপত্তা ফি কাটার পর যা নেট দাঁড়ায় প্রায় ১,০০০ ইউরো (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১,৩২,০০০ টাকা)। দক্ষ পেশায় এই বেতন ১,৩০০ থেকে ১,৬০০ ইউরো এবং আইটি খাতে ১,৮০০ থেকে ২,৫০০ ইউরো পর্যন্ত হতে পারে।
বাধ্যতামূলক ছুটি ভাতা (Regres): প্রতি বছর ১ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিটি কোম্পানি তাদের কর্মীদের ন্যূনতম ১,৪৮২ ইউরো আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ‘বার্ষিক ছুটি ভাতা’ হিসেবে প্রদান করে থাকে।
আইইএলটিএস ও ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা নেই: ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার জন্য আইইএলটিএস ভাষা পরীক্ষার কোনো সনদ লাগে না। উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও কাজের কারিগরি দক্ষতা বা ট্রেড অভিজ্ঞতা থাকলে তা বিশেষ অগ্রাধিকার পায়।
স্বল্পতম ভিসা ফি ও প্রসেসিং খরচ: স্লোভেনিয়া সরকারের নির্ধারিত অফিশিয়াল ভিসা ফি মাত্র ৭৭ ইউরো (প্রায় ১০,০০০ টাকা)। প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস তৈরি, অনুবাদ ও ইনস্যুরেন্স মিলিয়ে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা এবং বিমান টিকিটসহ সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ২ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব।
কাজের সময় ও ওভারটাইম সুবিধা: সপ্তাহে সাধারণ কর্মঘণ্টা ৪০ ঘণ্টা। ওভারটাইমে মূল বেতনের চেয়ে ৩০% বেশি, রবিবারে কাজ করলে ৫০% বেশি এবং সরকারি ছুটির দিনে কাজ করলে ১০০% অতিরিক্ত বোনাস পাওয়া যায়।
চাহিদাভিত্তিক পেশা ও ‘লেবার মার্কেট টেস্ট’ ছাড়
স্লোভেনিয়া সরকার দ্রুত কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যে ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু ফাস্ট-ট্র্যাক পেশার ক্ষেত্রে ‘লেবার মার্কেট টেস্ট’ (স্থানীয় লোক পাওয়া যাচ্ছে কিনা তা যাচাইয়ের দীর্ঘ আইনি বাধ্যবাধকতা) সম্পূর্ণ শিথিল করেছে। ফাস্ট-ট্র্যাক তালিকার প্রধান পেশাগুলো হলো:
নির্মাণ খাত: ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, প্লাম্বার, লকস্মিথ ও টুলমেকার।
পরিবহন খাত: হেভি ট্রাক ড্রাইভার।
হসপিটালিটি ও সার্ভিস: বাবুর্চি, ওয়েটার, হোটেল ক্লিনার ও মেকানিক।
অন্যান্য খাত: সফটওয়্যার ডেভেলপার, নার্সিং অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, ফার্মার ও ফরেস্ট্রি ওয়ার্কার।
নিজ চেষ্টায় বিনামূল্যে চাকরি খোঁজার সরকারি ও বিশ্বস্ত মাধ্যম
কোনো এজেন্টের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি নিয়োগকর্তার কাছে আবেদনের বিশ্বস্ত মাধ্যমসমূহ:
১. ZRSZ (সরকারি এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস): স্লোভেনিয়া সরকারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ZRSZ-এর বিনামূল্যে ই-ফর্ম (e-form) পূরণ করে সিভি ও কাভার লেটার জমা দিলে স্লোভেনিয়ান নিয়োগকর্তারা সরাসরি প্রার্থীদের নির্বাচন করেন।
২. AJPES রেজিস্ট্রি: স্লোভেনিয়ার নিবন্ধিত কোম্পানিগুলোর ডেটাবেস থেকে এইচআর (HR) বা অ্যাডমিনদের ইমেইল সংগ্রহ করে সরাসরি আবেদনের সুযোগ রয়েছে।
৩. অন্যান্য নির্ভরযোগ্য পোর্টাল: JobsInSlovenia.info, LinkedIn এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের EURES পোর্টালে ইউরোপাস (Europass) ফরম্যাটের সিভি জমা দিয়ে আবেদন করতে পারবেন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
স্লোভেনিয়ায় কাজ ও বসবাসের জন্য ‘সিঙ্গেল পারমিট’ (Enoviti Dovoljenje) দেওয়া হয়, যা বর্তমানে প্রথম আবেদনের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২ বছরের জন্য ইস্যু করা হয়। এক্ষেত্রে যেসব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লাগবে সেগুলো হচ্ছে-
কমপক্ষে ৩ মাস মেয়াদসহ মূল পাসপোর্ট এবং ছবি।
গত ৬ মাসের মধ্যে প্রাপ্ত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।
কাজের অভিজ্ঞতার সনদ ও সংশ্লিষ্ট ট্রেড সার্টিফিকেট।
বিগত ৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও ৩০,০০০ ইউরো কাভারেজের ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স।
স্লোভেনিয়ান নিয়োগকর্তার সাথে চুক্তিকৃত এমপ্লয়মেন্ট কন্ট্রাক্ট।
সকল বাংলা ফাইল স্লোভেনিয়ান ভাষায় বিচার মন্ত্রণালয় অনুমোদিত অনুবাদক দিয়ে নোটারাইজড করতে হবে।
ভিসা প্রক্রিয়া
ঢাকায় স্লোভেনিয়ার অনারারি কনস্যুলেট শুধু তথ্যসেবা দেওয়ায় টাইপ-ডি ভিসার জন্য ভারতে অবস্থিত স্লোভেনিয়া দূতাবাসে আবেদন জমা দিতে হবে।
যাতায়াত, বাসস্থান ও জীবনযাত্রার খরচ
বিমান রুট: ঢাকা থেকে তুর্কি এয়ারলাইন্সে ইস্তাম্বুল হয়ে অথবা কাতার এয়ারওয়েজে দোহা হয়ে লুবলিয়ানা যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক, যেখানে আলাদা কোনো ট্রানজিট ভিসার প্রয়োজন পড়ে না।
বাসস্থান ও জীবনযাত্রা: রাজধানী লুবলিয়ানার তুলনায় মারিবোর বা সেলিয়ে শহরে থাকা অনেক সাশ্রয়ী। মারিবোরে শেয়ার্ড রুমে থাকার খরচ ২০০–৩০০ ইউরো এবং খাবারের খরচ ১৫০–২০০ ইউরো। মাসে মাত্র ৩৭ ইউরো দিয়ে লোকাল বাসের মান্থলি পাস পাওয়া যায়। ফলে মাসে মাত্র ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করে সিংহভাগ টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব।
স্থায়ী বসবাস (PR) এবং স্লোভেনিয়ান নাগরিকত্ব
স্থায়ী রেসিডেন্সি (PR): টানা ৫ বছর বৈধভাবে কাজ ও বসবাস করার পর এবং বেসিক ‘A2’ লেভেলের স্লোভেনিয়ান ভাষা পরীক্ষায় পাস করে স্থায়ী বাসিন্দার কার্ড পাওয়া যায়। সরকার বিনামূল্যে ১৮০ ঘণ্টার ভাষা কোর্স ও প্রথমবার পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দেয়। এই পিআর কার্ডের মেয়াদ ১০ বছর এবং এর মাধ্যমে ২৬টি সেনজেন দেশে মুক্তভাবে যাতায়াত করা যায়।
নাগরিকত্ব ও ইউ (EU) পাসপোর্ট: টানা ১০ বছর বৈধভাবে বসবাস করার পর এবং সকল ট্যাক্স পরিশোধ করে স্লোভেনিয়ান নাগরিকত্ব ও ইইউ পাসপোর্টের আবেদন করা যায়। এই পাসপোর্ট দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ ১৬০টিরও বেশি দেশে ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা পাওয়া যায়।
যা অবশ্যই মনে রাখতে হবে
অনলাইন স্ক্যাম থেকে দূরে থাকুন: ফেসবুকে বা ইউটিউবে ভুয়া “গ্যারান্টিড ওয়ার্ক ভিসা” বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হবেন না।
ট্যুরিস্ট ভিসায় কাজ নিষিদ্ধ: ট্যুরিস্ট ভিসায় স্লোভেনিয়ায় গিয়ে কাজের চেষ্টা করলে ১ থেকে ৫ বছরের জন্য পুরো সেনজেন এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ হতে পারে।
পৌঁছানোর পরের আইনি কাজ: স্লোভেনিয়ায় পৌঁছানোর ৮ দিনের মধ্যে স্থানীয় ‘Upravna Enota’-তে গিয়ে ঠিকানা রেজিস্ট্রেশন করা এবং ট্যাক্স নম্বর গ্রহণ করা আইনি বাধ্যবাধকতা।
ইমিগ্রেশন লয়ারের সাহায্য: ওয়ার্ক পারমিট রিনিউ, পিআর বা কাজের সুবিধার্থে স্লোভেনিয়ার নিবন্ধিত ইমিগ্রেশন লয়ারের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা সবচেয়ে নিরাপদ।
তানজিল আহমেদ জনি/ প্রবাস/ ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
