স্বল্প খরচে তিউনিশিয়ায় ব্যবসা ও নাগরিকত্বের সহজ পথ!
ভূমধ্যসাগরের তীরে গড়ে ওঠা উত্তর আফ্রিকার অন্যতম মনোরম মুসলিম দেশ তিউনিশিয়া। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বহু বছর ধরে কাজ করার সুযোগ দিলেও নাগরিকত্ব দেয় না; অন্যদিকে অবৈধ উপায়ে ইউরোপে পাড়ি জমিয়ে হাজারো মানুষের জীবন সংকটে পড়ে। তিউনিশিয়ায় কিভাবে নিজের নামে কোম্পানি গঠন করে, স্বল্প খরচে পরিবারসহ বৈধভাবে বসবাস এবং ৫ বছরে পাসপোর্টের আবেদন করা যায় সেই বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন তানজিল আহমেদ জনি।
কেন তিউনিশিয়া?
তিউনিশিয়া উত্তর আফ্রিকার একদম প্রান্তে, ইউরোপের ঠিক উল্টো দিকে অবস্থিত। এর পূর্বে লিবিয়া, পশ্চিমে আলজেরিয়া এবং উত্তরে সরাসরি ভূমধ্যসাগর। ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য—এই তিন সুবিশাল বাজারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান হওয়ায় আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্য তিউনিশিয়া এক কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু।
আকর্ষণীয় আবহাওয়া ও প্রকৃতি: ১৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সাদা বালুকাময় সৈকত, ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ফিরোজা পানি এবং কারথেজের প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন দেশটিকে অনন্য রূপ দিয়েছে। এখানকার জলবায়ু বাংলাদেশের মতোই চমৎকার (গ্রীষ্মে ২৫–৪০ ডিগ্রি এবং শীতকালে ৮–১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।
সামাজিক পরিবেশ: দেশের ৯৮% মানুষ মুসলিম, সর্বত্র হালাল খাবার এবং প্রতি মহল্লায় মসজিদ রয়েছে। তবে আরব বিশ্বের অন্যান্য কঠোর নিয়মের তুলনায় এটি যথেষ্ট উদার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতাসম্পন্ন দেশ।
ভিসা আবেদন ও যাতায়াত প্রক্রিয়া
বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য তিউনিশিয়ায় মূলত দুই ধরণের ভিসা ব্যবস্থা রয়েছে:
শর্ট স্টে ভিসা (C ক্যাটাগরি): সর্বোচ্চ ৯০ দিনের জন্য পর্যটন বা স্বল্পমেয়াদী ভ্রমণের উদ্দেশ্যে।
লং স্টে ভিসা (D ক্যাটাগরি): কাজ, ব্যবসা, পড়াশোনা বা পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
অন্তত ৬ মাসের মেয়াদ ও একটি ফাঁকা পাতাসহ মূল পাসপোর্ট।
সাম্প্রতিক তোলা ৩৫×৪৫ মিমি সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের ছবি।
বিগত ৩ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট।
হোটেল বুকিং বা ইনভিটেশন লেটার এবং ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স।
বাংলাদেশ পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।
তিউনিশিয়ায় ভ্রমণের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে একটি সুনির্দিষ্ট কাভার লেটার।
আবেদন জমা ও প্রসেসিং: ঢাকায় বর্তমানে তিউনিশিয়ার নিজস্ব দূতাবাস না থাকায় ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত তিউনিশিয়ান দূতাবাসে আবেদন জমা দিতে হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে (সৌদি, দুবাই, কাতার) অবস্থানরত প্রবাসীরা সেখানকার স্থানীয় তিউনিশিয়ান দূতাবাস থেকে সরাসরি আবেদন করতে পারবেন। ভিসা ফি প্রায় ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা এবং প্রসেস হতে ৫ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে।
ভ্রমণ ও এয়ারপোর্ট প্রো-টিপ: ঢাকা থেকে তিউনিসের উদ্দেশ্যে টার্কিশ এয়ারলাইন্স (ইস্তাম্বুল ট্রানজিট) অথবা কাতার এয়ারওয়েজ (দোহা ট্রানজিট)-এর ফ্লাইট রয়েছে, যেখানে আলাদা কোনো ট্রানজিট ভিসার প্রয়োজন হয় না। তিউনিস কারথেজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর শহরে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি না নিয়ে মাত্র ৪০ টাকা সমপরিমাণ ভাড়ায় পাবলিক বাসে করে প্রধান শহরে পৌঁছানো সম্ভব।
জীবনযাত্রার খরচ
তিউনিশিয়ায় বসবাসের খরচ গাল্ফ বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম:
বাসস্থান: ব্যাচেলরদের জন্য শেয়ার্ড রুম ভাড়া মাসে ৮,০০০–১২,০০০ টাকা। পুরো পরিবার নিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলে ফ্ল্যাট নিলে ২৭,০০০–৩০,০০০ টাকা এবং শহরের বাইরে ১৮,০০০–২০,০০০ টাকার মধ্যে ভালো মানের ফ্ল্যাট পাওয়া যায়।
খাবার ও যাতায়াত: নিজে রান্না করে খেলে মাসে ৫,০০০–৮,০০০ টাকা এবং যাতায়াতে ২,০০০–৩,০০০ টাকা খরচ হয়। এখানে ১ কেজি চালের দাম মাত্র ১৫৬ টাকা এবং ১ লিটার দুধের দাম ৪৮ টাকা।
মোট বাজেট: প্রতি মাসে একক ব্যক্তির লাইফস্টাইল ভেদে খরচ প্রায় ২২,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা।
কোম্পানি গঠন মাত্র ৪৩,০০০ টাকায় ও ৩টি লাভজনক ব্যবসার আইডিয়ারোডম্যাপ
তিউনিশিয়ায় চাকরির ন্যূনতম বেতন সরকারিভাবে বেশ কম (প্রায় ২৪,০০০ টাকা), তাই এটি মূলত ব্যবসা করার জন্য একটি আদর্শ দেশ।
কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া: বিদেশীরা সেখানে ‘SARL’ (প্রাইভেট লিমিটেড) কোম্পানি খুলতে পারেন। সরকারি খাতায় ন্যূনতম মূলধন প্রয়োজন মাত্র ১,০০০ দিনার বা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৩,০০০ টাকা। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই ৪৩,০০০ টাকা কোথাও আটকে থাকে না; কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে এই পুরো টাকাটাই ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা যায়। আইনজীবী ও সরকারি ফি বাবদ পকেট থেকে প্রকৃত খরচ হয় মাত্র ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকার মতো।
মালিকানার প্রকারভেদ:
অনশোর/সাধারণ ব্যবসা: রেস্তোরাঁ বা স্থানীয় দোকানে বিদেশীরা সর্বোচ্চ ৪৯% মালিকানা রাখতে পারেন (৫১% তিউনিশিয়ান পার্টনার প্রয়োজন)।
অফশোর/রপ্তানিমুখী ব্যবসা: ১০০% শতভাগ বিদেশী মালিকানায় কোম্পানি খোলা যায় এবং মাত্র ১০% কর্পোরেট ট্যাক্স সুবিধা পাওয়া যায়।
প্রতিশ্রুতিশীল ৩টি ব্যবসার সুযোগ:
অলিভ ওয়েল (রপ্তানি ও বোতলজাতকরণ): তিউনিশিয়া বিশ্বের ২য় বৃহত্তম অলিভ ওয়েল উৎপাদক দেশ। কিন্তু উৎপাদিত তেলের ৮৬% খোলা বা বাল্ক হিসেবে রপ্তানি হয়, মাত্র ১৪% বোতলজাত হয়। সরাসরি চাষীদের থেকে বাল্ক তেল কিনে নিজস্ব ব্র্যান্ড লেবেল লাগিয়ে বোতলজাত করে বাংলাদেশ বা গাল্ফ দেশগুলোতে রপ্তানি করলে প্রতি কেজিতে ১৫০–২০০ টাকা মার্জিন থাকে।
টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক (ইউরোপে রপ্তানি): ২০২৬ সালের শেষে বাংলাদেশ এলডিসি (LDC) স্ট্যাটাস হারালে ইউরোপে ডিউটি-ফ্রি সুবিধা কমে যাবে। কিন্তু তিউনিশিয়ার সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে সুতা বা ফ্যাব্রিক নিয়ে তিউনিশিয়ায় গার্মেন্টস বানিয়ে ইউরোপে ডিউটি-ফ্রি রপ্তানি করে বা সোর্সিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে প্রচুর আয় সম্ভব।
আইটি ও বিপিও (IT & BPO Offshore): ইউরোপ ও তিউনিশিয়ার টাইমজোন প্রায় একই। ১০০% বিদেশী মালিকানায় একটি আইটি অফশোর কোম্পানি খুলে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের দিয়ে ইউরোপিয়ান ক্লায়েন্টদের কাজ করিয়ে বিশাল প্রফিট মার্জিন তৈরি করা যায়।
৫ বছরে স্থায়ী বসবাস ও পাসপোর্টের রোডম্যাপ
তিউনিশিয়ায় বৈধভাবে বসবাস শুরু করলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ১ বছর মেয়াদী নবায়নযোগ্য রেসিডেন্ট কার্ড প্রদান করা হয়।
নাগরিকত্ব লাভের শর্তাবলী:
টানা ৫ বছর বৈধভাবে বসবাস করা।
আরবি ভাষার সাধারণ ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন।
ক্লিয়ার ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট এবং কোনো ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড না থাকা।
কোনো তিউনিশিয়ান নাগরিককে বিয়ে করলে ১ থেকে ৩ বছরের মধ্যেই নাগরিকত্বের আবেদন করা সম্ভব।
তিউনিশিয়ার পাসপোর্টের ক্ষমতা: তিউনিশিয়ার পাসপোর্ট পেলে বিশ্বের ৬৬টি দেশে (যেমন: জাপান, তুরস্ক, ব্রাজিল) ভিসা-ফ্রি ভ্রমণ করা যায়। তিউনিশিয়ার নাগরিকত্ব ও অভিজ্ঞতা থাকলে পরবর্তীতে পরিবারসহ ইউরোপ বা উন্নত বিশ্বে উচ্চশিক্ষা ও কাজের উদ্দেশ্যে বৈধভাবে সেটেল হওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।
রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার সহজ পথ তিউনিশিয়া নয়; তবে এটি একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম যেখানে সঠিক আইনি উপায়ে পদক্ষেপ নিলে খুব কম খরচে পরিবারসহ ইউরোপের দোরগোড়ায় স্থায়ী নাগরিকত্ব লাভ করা সম্ভব।
তানজিল আহমেদ জনি/ প্রবাস/ ৬ মার্চ ২০২৬
