‘২-৪ বছরের প্রস্তুতির মাধ্যমে টাচ রাগবি বিশ্বকাপ খেলব’: মো. আশিক হোসেন

দেশীয় ক্রীড়াঙ্গনে একদম নতুন খেলা টাচ রাগবি। এই খেলার বর্তমান অবস্থান, লক্ষ্য এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন বাংলাদেশ টাচ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মো. আশিক হোসেন। টেন্ডিরিটারডটকমের সঙ্গে দেওয়া বিশেষ এই সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরেছেন তানজিল আহমেদ জনি।

ট্রেন্ডিরিডার ডটকম: টাচ রাগবি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একেবারেই নতুন একটি ধারণা। এমন একটি নতুন খেলার ফেডারেশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা কেন অনুভূত হলো?

মো. আশিক হোসেন: আসলে আমি মূলধারার রাগবির সাথেই যুক্ত ছিলাম এবং রাগবি অনূর্ধ্ব-১৯ ও জাতীয় দলের সাবেক কোচ ছিলাম। দুই বছর আগে হঠাৎ অস্ট্রেলিয়ার এই টাচ রাগবি খেলাটি পর্যবেক্ষণ করা শুরু করি এবং তাদের সাথে যোগাযোগ করি। এটি নিয়ে পড়াশোনা ও বিশ্লেষণ করে দেখলাম, এই রাগবিতে একদমই ইনজুরি নেই। মূল রাগবি ‘বডি কন্ট্যাক্ট’ গেম হওয়ায় প্রচুর ইনজুরি হয়; কিন্তু এই সংস্করণে শারীরিক কন্ট্যাক্ট না থাকায় খেলোয়াড়েরা নিরাপদ থাকে। একজন কোচ হিসেবে আমি সবসময় খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করি। এছাড়া আমাদের সামাজিক প্রতিকূলতা, পুষ্টির অভাব, জিম ও প্রয়োজনীয় সুবিধার ঘাটতির কারণে মূল রাগবিতে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। তাই আমাদের পরিবেশের জন্য টাচ রাগবি খুবই উপযোগী বলে আমার মনে হয়েছে।

ট্রেন্ডিরিডার ডটকম: আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিটের সাথে কি যোগাযোগ হয়েছে?

মো. আশিক হোসেন: হ্যাঁ, ইতিমধ্যে আমাদের পক্ষ থেকে—বিশেষ করে আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ‘ফিট’ (FIT – Federation of International Touch), যার সদর দপ্তর অস্ট্রেলিয়ায়, তাদের সাথে যোগাযোগ করেছি এবং তাদের দেওয়া শর্তগুলো পূরণ করছি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি সপ্তাহে আমাদের কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হবে। এরপর ফিটের সাথে বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করে এই মাসের যেকোনো একদিন আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় বসা হবে। আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের বর্তমান অবস্থান থেকে তাদের সব শর্ত আমরা চূড়ান্তভাবে পূরণ করতে পারব। এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়াটা শুধুই সময়ের অপেক্ষা।

ট্রেন্ডিরিডার ডটকম: বাংলাদেশে কি অনুমোদন বা অ্যাফিলিয়েশন পাওয়া হয়ে গেছে?

মো. আশিক হোসেন: জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, যেকোনো অ্যাসোসিয়েশন যাত্রা শুরু করে নির্দিষ্ট সময় (৬ মাস বা ১ বছর) স্কুল টুর্নামেন্ট, অনূর্ধ্ব-১৪, অনূর্ধ্ব-১৬ ও জাতীয় লিগ ইত্যাদি আয়োজন করে সরকারের কাছে স্বীকৃতির আবেদন করতে পারে। আমরা সেটির খুব কাছাকাছি আছি; এক-দুই মাস পর আমাদের জাতীয় টুর্নামেন্ট শেষ হলেই ক্রীড়ামন্ত্রী ও ক্রীড়া পরিচালক বরাবর আবেদন করব।

ট্রেন্ডিরিডার ডটকম: জেলাভিত্তিক কার্যক্রম কেমন চলছে?

মো. আশিক হোসেন: আমরা ঢাকার বাইরের প্রতিটি জেলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। ইতিমধ্যে ৬৪ জেলার মধ্যে ১৫টি জেলায় আমাদের কার্যক্রম সক্রিয় আছে। আমাদের লক্ষ্য নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে ৩৫টি জেলাকে কাভারেজের আওতায় নিয়ে আসা। এরপর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিক অবস্থায় ১০টি ক্লাব নিয়ে ‘টাচ রাগবি ক্লাব কাপ’ আয়োজন করব।

ট্রেন্ডিরিডার ডটকম: বর্তমানে টাচ রাগবির কয়টি ক্লাব সক্রিয় রয়েছে?

মো. আশিক হোসেন: বর্তমানে টাচ রাগবির চার থেকে পাঁচটি ক্লাব সক্রিয় রয়েছে। ৩৫টি জেলা কাভারেজের আওতায় এলে বাকি ক্লাবগুলোকেও আহ্বান জানানো হবে। এছাড়া অ্যাসোসিয়েশন থেকে বল ও কোচসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে প্রতিটি ক্লাব ভালো মানের পারফরম্যান্স করতে পারে।

ট্রেন্ডিরিডার ডটকম: রেফারি ট্রেনিং নিয়ে কী ধরনের প্রস্তুতি চলছে?

মো. আশিক হোসেন: আমাদের পরিকল্পনা অনেক সুদূরপ্রসারী। বর্তমান সরকার সারা দেশের স্কুলে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করায় আমরা মূলত শারীরিক শিক্ষার শিক্ষকদের ট্রেনিংয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছি। ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে টাচ রাগবির একটি রেফারি ট্রেনিং কোর্স করানো হয়েছে এবং সামনে ৫০-৬০ জন ক্রীড়া শিক্ষক নিয়ে আরও বড় প্রোগ্রাম করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ট্রেন্ডিরিডার ডটকম: টাচ রাগবি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটা সমসাময়িক?

মো. আশিক হোসেন: তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমাদের দেশে খেলোয়াড়দের জন্য বিমা বা ইনস্যুরেন্স সুবিধা নেই; যার ফলে ইনজুরি হলে পরিবারকে কষ্ট পোহাতে হয়। টাচ রাগবিতে কোনো বডি কন্ট্যাক্ট বা মারামারি নেই—এটি নিট অ্যান্ড ক্লিন এবং বুদ্ধিমত্তা, গতি ও ভারসাম্যের খেলা। তাই ইনজুরি-মুক্ত হওয়ায় এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খেলা, যা নীরবে-নিভৃতে দ্রুত জনপ্রিয় পাচ্ছে।

ট্রেন্ডিরিডার ডটকম: বাংলাদেশের গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিবেশ ও বাস্তবতার সঙ্গে এই খেলাটিকে কতটা খাপ খাওয়ানো সম্ভব বলে মনে করেন?

মো. আশিক হোসেন: এটি খুবই সহজ; কারণ শুধু একটি বল থাকলেই যেকোনো ছোট মাঠে (যেমন ৭০ বা ৫০ মিটার) শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষা—যেকোনো মৌসুমে সর্বনিম্ন খরচে খেলা শুরু করা যায়। এটি খুব সহজেই শিশু ও তরুণ প্রজন্মের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হবে।

ট্রেন্ডিরিডার ডটকম: রাজধানীর স্কুলগুলোতে টাচ রাগবি চালুর পর বাস্তবে কেমন সাড়া মিলেছে?

মো. আশিক হোসেন: ঢাকার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো আগে কন্ট্যাক্ট রাগবি শুরু করলেও ইনজুরির ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু টাচ রাগবি ইনজুরিমুক্ত হওয়ায় তারা এখন তাদের কারিকুলাম ও সিলেবাসে এটি যুক্ত করতে চাইছে। এমনকি চট্টগ্রামের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগ (স্পোর্টস সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট) তাদের সিলেবাসে ৩ দিনের একটি টাচ রাগবি কোর্স যুক্ত করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

ট্রেন্ডিরিডার ডটকম: করপোরেট বিনিয়োগ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা—দুটিই যদি পর্যাপ্ত না থাকে, তাহলে টাচ রাগবি কি একসময় মুখ থুবড়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে না? নাকি এই নির্ভরতা ছাড়াই খেলাটিকে টেকসই করার মতো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ফেডারেশনের আছে?

মো. আশিক হোসেন: আমাদের লক্ষ্য প্রথম দিন থেকেই স্পষ্ট; আমরা ২ থেকে ৪ বছরের প্রস্তুতির মাধ্যমে টাচ রাগবি বিশ্বকাপ খেলব। আমাদের এক্সিকিউটিভ কমিটিতে বেশ কয়েকজন করপোরেট ব্যক্তিত্ব আছেন, যারা ইনজুরিমুক্ত খেলায় বিনিয়োগে আগ্রহী। ইতিমধ্যে এটি নিয়ে একটি অভাবনীয় সাড়া পাওয়া গেছে। আমার উদ্দেশ্য হলো টাচ রাগবিকে একটি সুদৃঢ় অবস্থানে নিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় কোচ ও সংগঠক তৈরি করা। আমি নিজে তৃণমূল ও স্কুল পর্যায় থেকে উঠে এসেছি, তাই ঢাকায় বসে না থেকে যেখানে খেলোয়াড় ও কোচ আছেন, সেখানে সরাসরি চলে যাচ্ছি।

আমাদের মূল লক্ষ্য অভিজ্ঞদের মূল্যায়ন করা। সংগঠনে যাদের ভালো সাংগঠনিক দক্ষতা আছে, তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যাদের টেকনিক্যাল জ্ঞান নেই কিন্তু আগ্রহ আছে, তাদের ট্রেনিং করিয়ে যোগ্য করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা রেডিমেড কোনো শর্টকাটে বিশ্বাসী নই। সভাপতি হিসেবে শুধু এসি রুমে বসে না থেকে মাঠে গিয়ে তরুণদের সাথে অনুশীলন করার মাধ্যমে মাঠের সম্পর্ক শক্তিশালী রাখাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা রাজধানী ঢাকা-কেন্দ্রিক বিলাসী কোনো কিছু করব না। রাঙামাটির জুরাছড়ির মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনূর্ধ্ব-১২ থেকে অনূর্ধ্ব-১৮ পর্যন্ত ১২০ জন শিক্ষার্থীকে অনুশীলনে আনা হয়েছে, যাতে আমাদের খেলোয়াড়ের সাপ্লাই চেইন সবসময় ঠিক থাকে।

ছবি সংগ্রহ : ফেইসবুক
তানজিল আহমেদ জনি/ ক্রীড়া/ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

You may also like...