দালাল ছাড়া নিজেই করুন আর্জেন্টিনার ভিসা!

ঢাকায় দূতাবাস চালুর পর বদলে গেছে দৃশ্যপট; সঠিক তথ্য ও নথিপত্র থাকলে এজেন্ট ছাড়াই মিলছে ভিসা।

ফুটবল বন্দনা কিংবা রঙিন সংস্কৃতির টানে লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী দেশ আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশিদের কৌতূহল আবহমানকালের। তবে এতদিন ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা ও তথ্যের অভাবে অনেকেই এই দেশে ভ্রমণের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতেন। কিন্তু সেই চিত্রে এখন বড় পরিবর্তন এসেছে। ঢাকাস্থিত আর্জেন্টিনা দূতাবাসের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হওয়ায় প্রবাসগামী, শিক্ষার্থী এবং পর্যটকদের জন্য উন্মোচিত হয়েছে এক নতুন দিগন্ত। সঠিক দিকনির্দেশনা জানা থাকলে কোনো থার্ড-পার্টি বা এজেন্ট ছাড়াই নিজে নিজে আবেদনের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার ভিসা লাভ করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট সূচক অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় আর্জেন্টিনার অবস্থান ১২তম। দেশটির পাসপোর্টধারী ব্যক্তি বিশ্বের ১০৫টি দেশে সম্পূর্ণ ভিসা-মুক্ত সুবিধা এবং ৫০টি দেশে ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’ সুবিধা পান। ফলে লাতিন আমেরিকার এ দেশটি কেবল ভ্রমণের জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশিদের জন্য এক সম্ভাবনাময় কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।

নিচে আর্জেন্টিনার বিভিন্ন ধরনের ভিসা ও আবেদনের বিস্তারিত প্রক্রিয়ার বিবরণ দেওয়া হলো:

১. ট্যুরিস্ট (ভ্রমণ) ভিসা

পর্যটনের উদ্দেশ্যে আর্জেন্টিনায় যেতে চাইলে ট্রাভেল হিস্ট্রি (Travel History) বা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ফ্রেশ পাসপোর্টের চেয়ে আগে থেকে ২-৩টি দেশে (যেমন: মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ) ভ্রমণের রেকর্ড থাকলে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

ব্যাংক ব্যালেন্স: আবেদনকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার ব্যালেন্স দেখানো বাঞ্ছনীয়।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: অন্তত ৬ মাসের মেয়াদসহ মূল পাসপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, পেশাগত পরিচয়পত্র (শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এনরোলমেন্ট লেটার), পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, হোটেল ও রিটার্ন টিকিটের কনফার্মড বুকিং, মেডিকেল ইনস্যুরেন্স এবং স্পনসরশিপ বা ইনভাইটেশন লেটার।

জরুরি শর্ত: আবেদনের সকল প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত নথিপত্র বাধ্যতামূলকভাবে স্প্যানিশ ভাষায় অনুদিত (Spanish Translated) এবং নোটারাইজড হতে হবে।

খরচ ও সময়: ভিসা ফি বাবদ আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৭,৫০০ থেকে ২৩,০০০ টাকা) খরচ হয়। অনুবাদ ও ইনস্যুরেন্স মিলিয়ে অতিরিক্ত ৮,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা লাগতে পারে। ভিসা প্রসেসিংয়ে সময় লাগে ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবস।

২. স্টুডেন্ট (শিক্ষার্থী) ভিসা

উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক গন্তব্য হিসেবে আর্জেন্টিনা দিন দিন শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে। দেশটির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার ক্ষেত্রে ২ থেকে ৪ বছর পর্যন্ত স্টাডি গ্যাপ (Study Gap) গ্রহণযোগ্য, তবে তার উপযুক্ত ও লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করতে হয়।

টিউশন ফি: বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্সভেদে বার্ষিক টিউশন ফি ১,৮০০ থেকে ৮,০০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ২ থেকে ১০ লাখ টাকা)।

ব্যাংক ব্যালেন্স: শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের অ্যাকাউন্টে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স দেখানো ভালো।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ইস্যুকৃত অফিশিয়াল এডমিশন লেটার, স্প্যানিশ ভাষায় অনুদিত একাডেমিক সনদপত্র, টিউশন ফি জমাদানের প্রমানপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং স্টাডি গ্যাপের সপক্ষে চাকরির সনদ বা প্রামাণ্য নথিপত্র।

সময়কাল: আবেদনের পর সম্পূর্ণ ভিসা প্রক্রিয়াকরণে সাধারণত ৪ থেকে ৮ সপ্তাহ সময় লাগে।

৩. বিজনেস (ব্যবসায়িক) ভিসা

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আর্জেন্টিনা ভ্রমণের ক্ষেত্রে আবেদন শক্তিশালী করতে আর্জেন্টিনার স্থানীয় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পার্টনার, কমার্শিয়াল চেম্বার অথবা নিবন্ধিত কোম্পানির অফিশিয়াল ইনভাইটেশন লেটার (আমন্ত্রণপত্র) থাকা বাধ্যতামূলক।

ব্যাংক ব্যালেন্স: ব্যবসায়িক ব্যাপ্তি ও আর্থিক লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা বা তার বেশি আর্থিক সক্ষমতা দেখাতে হয়।

প্রয়োজনীয় নথিপত্র: মূল পাসপোর্ট, বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যবসায়িক বৈধ কাগজপত্র (ট্রেড লাইসেন্স, আইআরসি ইত্যাদি), আর্জেন্টিনার কোম্পানির আমন্ত্রণপত্র ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স। প্রতিটি কাগজ স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করা আবশ্যক।

সময়কাল: আবেদন জমা দেওয়ার পর ভিসা পেতে ৩ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

সরাসরি যেভাবে আবেদন করবেন

আর্জেন্টিনার ভিসার জন্য কোনো মধ্যস্থতাকারী বা দালাল চক্রের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। আবেদনকারী সরাসরি ঢাকাস্থিত আর্জেন্টিনা দূতাবাসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে অথবা ইমেইলের মাধ্যমে সরাসরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করতে পারবেন। অ্যাপয়েন্টমেন্টের নির্ধারিত দিনে প্রয়োজনীয় ফাইল ও পাসপোর্টসহ স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে আবেদন জমা দিতে হবে।

বিশেষ সতর্কতা:

আবেদন প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার ভুয়া নথিপত্র বা অসত্য তথ্য প্রদান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা জরুরি। আর্জেন্টিনা ইমিগ্রেশন বিভাগ প্রতিটি কাগজপত্রের সত্যতা নিবিড়ভাবে যাচাই করে। সঠিক ও স্বচ্ছ তথ্য দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ ফাইল জমা দিলে কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই অনায়াসে আর্জেন্টিনার ভিসা পাওয়া সম্ভব।

তানজিল আহমেদ জনি/প্রবাস ডেস্ক / ৩ আগষ্ট ২০২৫

You may also like...